logo

মঙ্গলবার ১৩ মার্চ ২০১৮, ২৯ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৩৯

এটিসির দু’রকম নির্দেশনায় বিভ্রান্ত হন পাইলট
১৩ মার্চ, ২০১৮
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলার প্লেন বিধ্বস্ত হওয়ার জন্য সেখানকার বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলই (এটিসি) দায়ী। তাদের দু’রকম নির্দেশনার ফলেই বিভ্রান্ত হন বিএস২১১ ফ্লাইটের পাইলট। শেষতক এটিসির এই মারাত্মক ভুলে প্লেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ঝরে যায় ৪৯টি তাজা প্রাণ।

এটিসির সঙ্গে পাইলটের কথোপকথনের অডিও’র শেষ চার মিনিট বিশ্লেষণ করে এই খবর দিচ্ছে নেপালের সংবাদমাধ্যম। অডিওটি এরইমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে ইউটিউবে। তা শুনে বৈমানিকরাও বলছেন, এটিসির নির্দেশনার ফলে প্লেনের ককপিট বিভ্রান্ত হয়েছে। ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া ওই অডিও শুনে অনেকেই মন্তব্য করছেন, এটা পুরোপুরি এটিসির ভুল। তাদের ভুলের এমন মারাত্মক মাশুল গুনতে হলো বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্টদের।

সোমবার (১২ মার্চ) দুপুরে পার্বত্য শহর কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়। ঢাকা থেকে যাওয়া ৭৮ আসনের উড়োজাহাজটিতে চার ক্রুসহ মোট ৭১ আরোহী ছিলেন। এতে এখন পর্যন্ত ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ দফতর।

নেপাল টাইমসের প্রতিবেদনে পাইলটের সঙ্গে এটিসির কথোপকথনের শেষ চার মিনিট বিশ্লেষণ করে বলা হয়, পাইলট ও এটিসির আলাপে বিমানবন্দরের রানওয়ে ০২ (দক্ষিণ প্রান্ত) ও রানওয়ে ২০ (উত্তর প্রান্ত) নিয়ে বিভ্রান্তি (কনফিউশন) বোঝা গেছে। বিএস২১১ যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, অন্য প্লেনের নেপালি পাইলটরা শুনতে পান, এটিসি থেকে ইউএস-বাংলার পাইলটকে হুঁশিয়ার করা হচ্ছে যে, তাকে কিছুটা বিভ্রান্ত মনে হচ্ছে এবং তার উচিত রাডার অনুসরণ করা ও বিপজ্জনক পথ থেকে সরে যাওয়া। সেসময় বিমানবন্দরের পাশের পাহাড়ও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো না।

বিএস২১১ এর পাইলটের সঙ্গে আলাপের শুরুতেই এটিসিকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি আবারও বলছে রানওয়ে ২০ এর দিকে এগোবেন না।’

এরপর পাইলটকে আবার হুঁশিয়ার করে বলা হয় যেন অবতরণ না করেন, কারণ আরেকটি প্লেন নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রানওয়ে ২০ বা উত্তর প্রান্তে না নামার জন্য হুঁশিয়ারি পেয়ে পাইলট যখন ডান দিকে ঘুরতে প্রস্তুতি নেন, তখন তাকে আবার এটিসি থেকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি কি রানওয়ে ০২ (দক্ষিণ প্রান্ত) নাকি ২০-এ নামতে চান। তখন পাইলট জবাব দেন, ‘আমরা রানওয়ে ২০-এ নামতে চাই’। এরপর তাকে রানওয়ে-২০ এর শেষ প্রান্তে অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়।

তখন বমবার্ডিয়ার প্লেনটিকে আবার প্রশ্ন করা হয়, তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন কি-না? পাইলট উত্তর দেন, ‘নেগেটিভ’ অর্থাৎ নেতিবাচক। এতে তাকে আবার ডান দিকে ঘুরতে বলা হয়। তখন বিএস২১১ পাইলট বলেন, ‘অ্যাফারমেটিভ’ অর্থাৎ তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন। এই অবস্থায় পাইলট বলে ওঠেন, আমরা রানওয়ে ০২-এ নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি। যে রানওয়ে নিয়ে কথা হচ্ছিল, এটিসিও তখন তা ভুলে প্লেনটিকে রানওয়ে ০২-নামতে অনুমতি দিয়ে দেয়।

এদিকে তখন ১০ কিলোমিটার দূরে থাকা সেনাবাহিনীর একটি প্লেনকে এটিসি আবার ঠিক উল্টোটিই বলছিল, ‘বাংলাদেশের প্লেনটির জন্য রানওয়ে ২০ চূড়ান্ত।’

শেষ দিকে ইউএস-বাংলার পাইলটের গলায় অস্পষ্ট স্বরে শোনা যাচ্ছিল, ‘স্যার, আমরা কি নামার অনুমতি পেয়েছি?’ কিছুক্ষণ নীরব থেকে এটিসি কন্ট্রোলারকে উচ্চৈঃস্বরে হুঁশিয়ার করে বলতে শোনা যায়, ‘আমি আবারও বলছি, ঘোরাও...’

এরপর কিছুক্ষণ নীরব থাকে সব, ফের এটিসি থেকে অগ্নিসংকেত বাজতে শুরু করে। তার অর্থ, প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং অগ্নিনির্বাপণী সংকেত চালু হয়েছে। এরপর একজন নেপালি পাইলট প্রশ্ন করেন রানওয়ে বন্ধ কি-না, তখন এটিসির তরফ থেকে বলা হয়, ‘রানওয়ে বন্ধ’।

সন্ধ্যায় রাজধানীর বারিধারায় ইউএস-বাংলার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করে এটিসির ভুল নির্দেশনার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেন এয়ারলাইন্সটির সিইও ইমরান আসিফও। এ সন্দেহের বিষয়ে বিবিসি, আল জাজিরা, চ্যানেল নিউজ এশিয়াসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও খবর প্রকাশ করেছে।

ইউএস-বাংলার সিইও বলেন, বিমানবন্দরের এটিসি টাওয়ার সঙ্গে পাইলটের কথোপকথনের অডিও পেয়েছি। এই রেকর্ডবার্তা শুনলে আপনারা বুঝতে পারবেন, আমাদের ধারণা এটিসি টাওয়ারের ভুল নির্দেশনার কারণে প্লেন বিধ্বস্ত হয়েছে।

অভিযোগ করা হচ্ছে কি-না, এমন প্রশ্ন করা হলে ইমরান আসিফ বলেন, আমরা অভিযোগ করছি না, সন্দেহ করছি। বিমানবন্দরের কোন দিক দিয়ে রানওয়েতে ফ্লাইটটি অবতরণ করবে, সে বিষয়ে কোনো ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছে। অডিওটি ইতিমধ্যে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে।

আবেদ সুলতান নামের পাইলট বিমান বাহিনীর সাবেক অফিসার জানিয়ে ইউএস-বাংলার সিইও বলেন, তিনি জীবিত রয়েছেন। তার পাঁচ হাজার ঘণ্টার ফ্লায়িং অভিজ্ঞতা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের মনে হচ্ছে, যান্ত্রিক কোনো ত্রুটি নয়, বৈমানিকেরও কোনো গাফেলতি ছিল না, এটিসির কোনো গাফেলতি ছিল।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, ‘ইউএস-বাংলার সিইও ইমরান আসিফ বলেছেন, এটিসি থেকে ভুল নির্দেশনা ছিল, আমাদের পাইলটের কোনো ভুল ছিল না। ৫ হাজার ঘণ্টা ফ্লাই করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন তিনি। এটিসিই অবতরণের সময় তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে।’

এদিকে, দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া বসন্ত বোহরা নামে একটি ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের যাত্রীও টুইট করে বলেছেন, প্লেনটি ঢাকা থেকে নির্বিঘ্নে উড্ডয়ন করলেও কাঠমান্ডুতে নামার সময়ই কিছু একটা ঘটনার শিকার হয়। তারপর দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।

অন্যদিকে, দুর্ঘটনায় হতাহতদের শোকাহত স্বজনদের নেপাল নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে ইউএস-বাংলা। এয়ারলাইন্সটি বলেছে, তাদের ব্যবস্থাপনায় হতাহতদের স্বজনদের নেপালে নিয়ে যাওয়া হবে, যেন নিহত প্রিয়জনকে শনাক্ত বা আহত প্রিয়জনের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারেন তারা।

সর্বশেষ খবর

শেষ পাতা এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by