logo

মঙ্গলবার ১২ সেপ্টম্বর ২০১৭, ২৮ ভাদ্র ১৪২৪, ২০ জিলহজ ১৪৩৮

শিরোনাম

ভেঙ্গে পড়বেন না, নিজের দেশে অবশ্যই ফিরতে পারবেন: প্রধানমন্ত্রী
১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রাণ ভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদারবাহিনী আমাদের ঘর পুড়িয়েছে, সেসময় আমরা সব হারিয়েছি। এরপরও ভেঙ্গে পড়িনি। আপনারও ভেঙ্গে পড়বেন না, নিজের দেশে অবশ্যই ফিরতে পারবেন।

মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে গিয়ে তিনি মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিজের দেশের নাগরিক অন্যের দেশে থাকা সম্মানজনক নয়।

সহায়সম্বলহীন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় তাদের বেদনার্ত জীবনের গল্প শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। পরে উপস্থিত শরণার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই নাগরিক। আর নিজেদের নাগরিকদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে তারা। এ সময় মানবিক কারণে তাদের সাময়িক আশ্রয়ের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী।

‘তাদের রাখার ব্যবস্থা এবং তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা আমরা আমাদের মতো করে যাব। এ ব্যাপারে কোনো সমস্যা হবে না’, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

‘মিয়ানমার সরকারকে আমি বলব, তারা যেন নিরীহ মানুষগুলোর ওপর কোনোরকম নির্যাতন না করে, এগুলো যেন তারা বন্ধ করে। প্রকৃত দোষী যারা, তাদের খুঁজে বের করুক। আর এ ব্যাপারে আমরা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে…যে ধরনের সাহায্য দরকার, আমরা তা করব’, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারই এ সংকট সৃষ্টি করেছে। তাই সমস্যা নিরসন করতে হবে তাদেরই। ফিরিয়ে নিতে হবে তাদের বাসিন্দাদের। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মানবাধিকার সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

‘আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রত্যেকটা সংস্থাকে আমি বলব যে, মিয়ানমার সরকারের ওপর তারা যেন চাপ প্রয়োগ করে, যেন তারা তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং এদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করবার কোনো অধিকার তাদের নাই। কারণ এরা তাদের দেশেরই নাগরিক’, বলেন শেখ হাসিনা।

‘কাজেই তাদের ফেরত নিতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে, তারা যেন ভালোভাবে বসবাস করতে পারে, তার ব্যবস্থা তাদের করতে হবে। আর এর জন্য প্রতিবেশী দেশ হিসেবে …সহযোগিতা করার দরকার, সহযোগিতা আমরা তা করব। কিন্তু এভাবে অমানবিক আচরণ যেন না করে’, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

“আমরা শান্তি চাই, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব অব্যাহত রাখতে চাই। তবে কোনো দেশের অন্যায় আমরা মেনে নেব না। মানবিক দিক বিবেচনা করেই আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। তাদের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি।”

শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘আর্তমানবতার প্রয়োজনে যতক্ষণ আপনাদের পাশে থাকা দরকার আমরা পাশে থাকব। এজন্য জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বর্ডারগার্ড সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঘর পোড়ানোর যন্ত্রণা অনুধাবন করতে পারি বলেই মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। যতটুকু পারি আশ্রিতাদের সহযোগিতা দেব। তবে বিশ্ববাসীকেও সঙ্গে থাকাতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। মানবতার খাতিরে এই দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। যতদিন মিয়ানমার সরকার তাদের ফিরিয়ে নিয়ে না যাবে, ততদিন আশ্রয়ের ব্যবস্থা করব।

এ সময় নারী ও শিশুদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলে চোখ ভিজে ওঠে শেখ হাসিনার। তার সঙ্গে থাকা ছোট বোন শেখ রেহানাকেও চোখ মুছতে দেখা যায়।

তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ না দিয়ে, ত্রাণ যেন স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দেয়া হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

পরে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন।

এর আগে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি ১৯০৯ ফ্লাইটটি অবতরণ করে কক্সবাজার বিমানবন্দরে।

এসময় বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

বিমানবন্দরে অবতরণের পর সেখান থেকে সড়কপথে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের পথে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, পূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, হুইপ ইকবালুর রহিম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন।

গত ২৫ আগষ্ট মিয়ানমারের কয়েকটি সেনা ও পুলিশের চৌকিতে রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের হামলার অভিযোগে আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। হত্যা, ধর্ষণের পাশাপাশি গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই অবস্থায় গত দু’সপ্তাহে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের দেয়া তথ্যানুযায়ী আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘর্ষ-সহিংসতা সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের আগস্টে গঠিত হয় অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন এক বছরের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চির কাছে জমা দেয় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট।

৬৩ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ত্রিশটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।

সেনাবাহিনীর ওই হামলায় এখনও পর্যন্ত ৪শ’র বেশি মানুষ মারা গেছে, আর প্রাণভয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে বাংলাদেশে। নৌপথে পালিয়ে আসার পথে নৌকাডুবিতেও বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই হত্যাকাণ্ড শুরু করে।

সর্বশেষ খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by