logo

শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলকদ ১৪৩৯

ভুল চিকিৎসার প্রমাণ পায় না বিএমডিসি!
২১ জুলাই, ২০১৮
চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে রোগীর প্রতি অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। এসব অভিযোগের তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা বা সুপারিশ করে থাকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিএমডিসির যেসব নিয়মনীতি রয়েছে, তা দিয়ে কোনও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন। কারণ, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ দ্বিতীয় কোনও চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ ছাড়া প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাহেদুল হক বসুনিয়া বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতো পিএমডিসি। বাংলাদেশে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত ও এ বিষয়ে যে কোনও ব্যবস্থা নিয়ে থাকে বিএমডিসি। তিনি বলেন, ‘যদি রোগীর আত্মীয়-স্বজন প্রথম চিকিৎসকের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এনে রোগীকে দ্বিতীয় কোনও চিকিৎসকের কাছে নিয়ে না যান, তাহলে বিষয়টি প্রমাণ করা কঠিন হয়। কারণ, প্রথম চিকিৎসকের ভুল হলে রোগীকে দ্বিতীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে রোগী সেরে উঠতে পারেন। আবার রোগী মারাও যেতে পারেন। তবে দ্বিতীয় চিকিৎসকই বলতে পারবেন যে, প্রথম চিকিৎসক ভুল চিকিৎসা দিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, একজন চিকিৎসকই কেবল বলতে পারেন যে, এই রোগীর ডায়াগনোসিসে ভুল হয়েছে কিনা।অন্য কারও পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয়।’জাহেদুল হক বসুনিয়া জানান, বিএমডিসিতে অভিযোগ করার জন্য রেজিস্ট্রার বরাবর একটি সাধারণ দরখাস্ত জমা দিতে হয়। দরখাস্তের সঙ্গে রোগীর সব ধরনের ডকুমেন্ট জমা দিতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে দেখি, রোগীর ডায়াগনোসিস রিপোর্ট ও ট্রিটমেন্টে কোনও তফাত হয়েছে কিনা। যদি তফাত দেখতে পাই, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আমরা অভিযোগ আমলে নিয়ে নেই।’

বসুনিয়া বলেন, ‘যদি রোগীর ডায়াগনোসিস ও ট্রিটমেন্ট ঠিক থাকে, কিন্তু তারপরও ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়,তখন কম করে দু’জন চিকিৎসকের ডায়াগনোসিস রিপোর্ট দরকার হয়। তা না হলে প্রমাণ করা যায় না রোগী ভুল ট্রিটমেন্টের শিকার হয়েছেন,বা ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল

এছাড়া, রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ থাকলে আমরা সেটাও আমলে নিয়ে তদন্ত করি। তবে দুর্ব্যবহার প্রমাণ করা আরও কঠিন!’

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ মোবাইল ফোনে বলেন,‘রোগীর চিকিৎসায় ভুল যে হয় এটা ঠিক। অবহেলা যে হয় এটাও ঠিক। না হলেও প্রমাণ করতে হবে, হলেও প্রমাণ করতে হবে। রোগী অন্য চিকিৎসকের কাছে গেছেন কিনা,সেটা বড় বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্পেশালিস্ট নিয়ে তদন্ত কমিটি করেই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের প্রমাণ করতে হবে।’

তিনি বলেন,‘ কোনও চিকিৎসকের চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টি কেবল কোনও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলতে পারবেন। অন্য কারেও পক্ষে বলা সম্ভব নয়। অভিযোগ আসলে তা প্রমাণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। এরপর তদন্ত হতে পারে। তারপর অ্যাকশনে যেতে পারবে।কোনও অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অ্যাকশনে যাওয়া যাবে না।’

ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে হবে। আর দোষী না হলে চিকিৎসককে অব্যাহতি দিতে হবে।।’

বিএসএমএমইউ এর অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক বলেন, ‘ যে দেশ যত সভ্য, সেদেশে তত মানুষ হাসপাতালে মারা যায়। এটা সভ্যতার একটা সূচক। একটা দেশের কত ভাগ মানুষ হাসপাতালে মারা যায়? কতজন রাস্তায় মারা যায়? কতজন বাড়িতে মারা যায়। হাসপাতালে মারা যাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয়কে নির্দেশ করে — মানুষ সচেতন, রোগীর অসুখ হলেই সে হাসপাতালে আসবে। মানুষ তো মারা যাবে হাসপাতালেই, বাড়িতে কেন মারা যাবে? হাসপাতালে রোগীর জন্ম এবং মৃত্যু হবে। যারা ধর্মে বিশ্বাস করে না, তারা শুধু আবোল-তাবোল কথা বলবে। যদি কেউ বেঁচে থাকতে পারতো,আয়ুর ওপর যদি কারও হাত থাকতো, তাহলে জহুরুল ইসলাম সাহেব মারা যেতেন না। টাটা বিড়লাও মারা যেতেন না। এটা কি বাস্তবে সম্ভব? ফলে, অবহেলার বিষয়টি ডায়াগনোসিস করার জন্য বিএমডিসি কাজ করে। কমপক্ষে তিন জন বিশেষজ্ঞ যদি বলে যে, এটা ঠিক হয়নি। তাহলে বলা যাবে। এর আগে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ বলা যাবে না।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘ভুল চিকিৎসায় মারা গেছে, রোগীর স্বজনরা এ ধরনের অভিযোগ করতেই পারেন। কিন্তু মৃত্যুটা ভুল চিকিৎসায় হয়েছে কিনা,তা নির্ণয় করতে হলে যে ডিসিপ্লিন, জেনারেল সার্জারি, প্লাস্টিক সার্জারি বা গাইনোকলজিস্ট, সেই ডিসিপ্লিনের চিকিৎসকদের নিয়ে এবং অন্য নিরপেক্ষ কাউকে নিয়ে বোর্ড গঠন করে সিদ্ধান্তটা দেওয়া উচিত যে— এই ডায়াগনোসিস ভুল না সঠিক। হঠাৎ করে ভুল বলা যাবে না। কেউ বললেই ভুল চিকিৎসা হয়ে গেলো, এটা আমি মানতে চাই না। এটার জন্য জুডিশিয়াল মেডিক্যাল বোর্ড করে তারপরে বলতে হবে যে, ভুল চিকিৎসা কিনা।’


বিএমডিসির সাম্প্রতিক শাস্তির খতিয়ান
বিএমডিসির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই পর্যন্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বিএমডিসিতে অভিযোগ এসেছে মোট ১৯৩টি (২০১৭ সালে এসেছে ১২টি। ২০১৮ সালে ১ জানুয়ারি থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত অভিযোগ এসেছে ১৬টি)।এরমধ্যে ১০০টির বেশি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাকি অভিযোগগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় করা হয়নি বলে তা আমলে নেয়নি বিএমডিসি।

জানা যায়,বিএমডিসিতে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসে এগুলোর ধরণ হচ্ছে— ভুয়া ডিগ্রি সংক্রান্ত সনদ যাচাই, রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই বিদেশি ডাক্তারদের প্রাকটিস,ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসায় অবহেলা, রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের দুর্ব্যবহার ইত্যাদি।


পাঁচ চিকিৎসককে শাস্তি
এবছর পাঁচ জন চিকিৎসককে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছে বিএমডিসি। শাস্তিপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের মধ্যে আছেন— উত্তরা আধুনিক মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. ওমর আলী (বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৫৮২০) ও শাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজের গাইনি অ্যান্ড অবস্ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কুররাতুল আইনুল ফরহাদ (বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর এ-২৩৯৪১)। চিকিৎসা সংক্রান্ত অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ডা. মো. ওমর আলীর রেজিস্ট্রেশন তিন মাসের জন্য ও কুররাতুল আইনুল ফরহাদের রেজিস্ট্রেশন ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া,শিকদার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ডেকে নিয়ে সাংবাদিক শিশির মোড়লকে মারধর করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চিকিৎসক সফিউল আজমের রেজিস্ট্রেশন আজীবনের জন্য স্থগিত করেছে বিএমডিসি। শাস্তিপ্রাপ্ত অন্য জনের নাম জানাতে পারেনি বিএমডিসি।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে শিশু রাইফার মৃত্যুর ঘটনায় ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠেছে। রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে শিশু মো. আরিয়ান আহমেদও ভুল চিকিৎসায় মারা গেছে বলে অভিযোগ করেন তার স্বজনরা। ঢাকায় একজন শিশু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অন্য একজন শিশু চিকিৎসকের সন্তানকে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। এছাড়া, কুমিল্লায় শিশু মেহেদী হাসান, নারায়ণগঞ্জে এক প্রসূতি ও ভোলায় একজন বয়স্ক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে ভুল চিকিৎসায়, এমন অভিযোগ তাদের আত্মীয়-স্বজনের। এসব মৃত্যুর কারণে ভুল চিকিৎসার বিষয়টি এখন সারা দেশে ব্যাপক আলোচিত বিষয়।

সর্বশেষ খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by