logo

বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ০৪ জিলহজ ১৪৩৯

রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্রে ‘মিয়ানমার নাগরিক’ লেখা হবে না
১৬ আগস্ট, ২০১৮
রাখাইন থেকে নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গার পরিচয়পত্রে তাদেরকে ‘মিয়ানমারের নাগরিক’ হিসেবে উল্লেখ না করতে আহ্বান জানিয়েছে মিয়ানমার। বাংলাদেশ সরকারও এতে সম্মতি জানিয়েছে। ফলে এখন থেকে রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্রে তাদের ‘রাখাইনের বাস্তুচ্যুত’ বলে উল্লেখ করা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদের সাম্প্রতিক মিয়ানমার সফরে এই সমঝোতা হয় বলে দাবি করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

গত বছরের ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বলা হলেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে এবং তাদের ফেরার সব পথ বন্ধ করতে আরসার হামলার আগে থেকেই পরিকল্পিত সেনা-অভিযান শুরু হয়েছিল। চলমান জাতিগত নিধনে হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ। এক বছরেও মিয়ানমারের এই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। এখনও আশার আলো দেখার মতো, নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থায় নেই বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ। তারও আগে থেকে বাংলাদেশে রয়েছেন আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। সম্প্রতি জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাংলাদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দশ লাখের বেশি। বাংলাদেশ সরকারের দাবি, রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১১ লাখের বেশি।

সম্প্রতি মিয়ানামরে তিনদিনের সফর করেছেন বাংলাদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলি। এ সময় তিনি রাখাইনের মংডু শহরেও যান। সফরে নেইপিদো ও রাখাইনে দেশটির সমাজকল্যাণমন্ত্রী মিন্ত সোয়ে ও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টার কার্যালয়ের মন্ত্রী ইউ কিয়াও তিন্ত সোয়ে ও একটি আন্তঃধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আবুল হাসান।

শনিবার মিয়ানমার ঘোষণা দেয়, তারা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাতটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন। এরমধ্যে একটি ছিল, রোহিঙ্গাদের দেওয়া কার্ডের তথ্য সংস্করণ।

সোমবার উ উইন মিয়া ইরাবতীকে বলেন, মিয়ানমার আবুল হাসানকে বলেছে যেন পরিচয়পত্রে ‘মিয়ানমার নাগরিক’ বা ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত’ লেখা না হয়। তবে ঘোষণায় বলা হয়নি মিয়ানমার কী চায়।

তবে উ উইন মিয়াত আয়ে দাবি করেন, শরণার্থীরা সবাই সেনা বাহিনীর অভিযানের মুখে পালাতে বাধ্য হয়নি। কয়েকজন হয়তো নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়েছেন। তবে বেশিরভাগই প্রতিবেশীরা চলে যাওয়ায় চলে গিয়েছেন। কারণ তখন তাদের বাস করা কঠিন হয়ে পড়তো। তিনি বলেন, ‘তাদের ঘর ছাড়ার কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়নি। নিজের ইচ্ছাতেই তারা গেছে। আর প্রকৃত পরিস্থিতির বর্ণনাও তারা দেয়নি।’

উইন মিয়াত বলেন, কয়েকজন হয়তো মিয়ানমারের নাগরিক। তবে তাদের বেশিরভাগেরই যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।

১১ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে মিয়ানমারের সঙ্গে কোনও সমঝোতার কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিবৃতিতে দুইবার রোহিঙ্গাদের ‘বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র দেওয়া শুরু হয়। তবে বেশিরভাগ রোহিঙ্গাই তা নিতে রাজি হননি। কারণ তাতে জাতিগোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গা পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে নাম, বাবা-মার নাম, বয়স, জন্মস্থান ও জাতীয়তার উল্লেখ ছিলো। বাংলাদেশ সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই তাদের গোত্র উল্লেখ করা হয়নি।

অক্টোবরের শুরুর দিকে ‘রোহিঙ্গা রেজিস্টেশন’ নামে আরেকটি কার্ড দেওয়া হয়। এখানেও জন্মস্থান উল্লেখ করা হয়। তবে প্রথম কার্ডটির গ্রহণযোগ্যতা বাতিল করা হয়েছে কি না সেই বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। বাংলাদেশে অভিবাসন অধিদফতর থেকেই কার্ড দুটি দেওয়া হয়েছিলা।

এদিকে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ১২ বছরের বেশি বয়সী শরণার্থীদের আরেক ধরনের পরিচয়পত্র সরবরাহ করেছে। বায়োমেট্রিক ডাটা সম্বলিত এই কার্ডেও তাদের জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি।

বাংলাদেশের দেওয়া এই পরিচয়পত্রের কথা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ছাড়াও মিয়ানমার দাবি করে, প্রত্যাবাসন আলোচনা সহজ করতে আবুল হাসান দুই দেশের মধ্যে হটলাইন চালুর ব্যাপারে একমত হয়েছেন। আশ্রয় শিবিরে ফরম সরবরাহ করার কথাও জানায় তারা। তবে এই ফরম অবশ্যই স্বেচ্ছায় পূরণ করত হবে।

বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য জানান, মন্ত্রী পর্যায়ে প্রত্যাবাসন ইস্যু নিয়ে আলোচনার সময় মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের আইডি কার্ডের শব্দ নিয়ে আপত্তি তোলে। মিয়ানমার দাবি করে, বাংলাদেশে পালিয়ো আসা মানুষের মিয়ানমারের নাগরিক নয় কিন্তু তারা রাখাইনে বাস করত। আমরা তাদের কথা শুনি এবং রোহিঙ্গাদের আইডি কার্ডে পরিচয় রাখাইনের বাস্তুচ্যুত লিখতে সম্মত হই।

বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শনিবারের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সীমান্তে খুব শিগগিরই ৪-৫টি ট্রানজিট ক্যাম্প নির্মাণ করা হবে। মাদকবিরোধী যৌথ অভিযান চালানা হবে। সীমান্তে ৩৪-৩৫টি পোস্টে যৌথ জরিপও চালানো হবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে সহায়তা করা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আবুল হাসান মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়েছেন যেন রোহিঙ্গাদের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম পুনর্নির্মাণ করে প্রস্তুত করা হয় আবার। এমন ৪২টি স্থানের কথা মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে বলে জানান আবুল হাসান।

মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমারকে আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তার রোহিঙ্গাদের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড নিয়ে আশ্বস্ত করে। মিয়ানমার তাদের একটি দলকে শরণার্থী ক্যাম্পে পাঠাতে রাজি হয়েছে। তারাই রোহিঙ্গাদের বুঝিয়ে বলবে যে এই কার্ডের ‍সুবিধাগুলো।

সর্বশেষ খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by