logo

রোববার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০১ আশ্বিন ১৪২৫, ৫ মহররম ১৪৪০

আওয়ামী লীগে গৃহবিবাদ ধীরে এগোচ্ছে বিএনপি
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮
নিউজ ডেস্ক
গাজীপুর জেলার একটি মাত্র উপজেলা কাপাসিয়া নিয়ে গঠিত গাজীপুর-৪ আসন। এ আসনে ভোটার ৩ লাখ ২ হাজার ২৪৫ জন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম রূপকার ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জন্মভূমি কাপাসিয়া। আওয়ামী রাজনীতিতে তাজউদ্দীন পরিবারের ভূমিকা ও প্রভাবের কারণে তৃণমূল বেশ সংহত ছিল। তবে একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে কাপাসিয়া আওয়ামী লীগে গৃহবিবাদের কারণে অস্থিরতা বিরাজ করছে। কৃষক লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বই দলটির মাথাব্যথার অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে বিএনপির দীর্ঘদিনের কাণ্ডারি ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহর পরিবারও কম প্রভাবশালী নয়। হান্নান শাহর ছোট ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নান বাবার মৃত্যুর পর হাল ধরেছেন বিএনপির। শাহ রিয়াজুল ছাড়াও বিএনপির আরও দু’জন মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে রয়েছেন।

সব মিলিয়ে ভোটের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নানাভাবে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। সভা-সমাবেশ, কবর জিয়ারত, ঘরোয়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন। এ আসনে মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যেই ভোটের লড়াই হবে।

স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে কাপাসিয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি তাজউদ্দীন আহমদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৯১ সালের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ কাপাসিয়ায় দলকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ জাসদের প্রার্থী ক্যাপ্টেন সুলতান উদ্দীন আহম্মদকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের সিপিবির প্রার্থী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জাতীয় পার্টির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. রেজাউল করিম ভূঁইয়াকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন।

১৯৮৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ওবায়েদ উল্লাহ জাতীয় পার্টির এমএ মজিদকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহ আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মিণী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেন।

১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ডা. মো. ছানাউল্লাহ আওয়ামী লীগের ফকির সাহাব উদ্দিনকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে হান্নান শাহ নির্বাচিত হন। ফের ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তাজউদ্দীনের ছোট ভাই অ্যাডভোকেট আফসার উদ্দীন আহমদ ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন।

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নবীন প্রার্থী তাজউদ্দীনপুত্র তানজিম আহমদ সোহেল তাজ বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হান্নান শাহকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তানজিম আহমদ সোহেল তাজ বিএনপি প্রার্থী শিল্পপতি এমএ মজিদকে পরাজিত করে ফের নির্বাচিত হন।

তিনি মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। কিছু দিন পর তিনি প্রথমে মন্ত্রিত্ব ও পরে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০১২ সালে উপনির্বাচনে সোহেল তাজের বড় বোন সিমিন হোসেন রিমি তারই চাচা অ্যাডভোকেট আফসার উদ্দীন আহমদ খানকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে ১০ম সংসদ নির্বাচনে সিমিন হোসেন রিমি জাতীয় পার্টির প্রার্থী ড. মিয়া মো. আনোয়ার হোসেনকে পরাজিত করে ফের নির্বাচিত হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে মাঠে বেশি সক্রিয় বর্তমান এমপি সিমিন হোসেন রিমি ও তারই ফুপাতো ভাই শিল্পপতি আলম আহমদ। তিনি কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। এছাড়াও কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা মনোনয়ন চাইতে পারেন।

সিমিন হোসেন রিমি বলেন, এলাকার মানুষ যাতে ভালোভাবে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে পারেন সে চেষ্টাই করেছি। কাপাসিয়ার জনগণই আমার কাজের মূল্যায়ন করবেন। স্থানীয় কৃষক লীগের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, আমি সুস্থ প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী, তাই মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চাই। বিভ্রান্তিকর কোনো কাজ করতে চাই না, যতটুকু সম্ভব সঠিক কাজই করার চেষ্টা করি। নেত্রী আমার কাজের মূল্যায়ন করে আবারও নিশ্চয় দলীয় মনোনয়ন দেবেন।

জানা গেছে, মতবিরোধের কারণে দীর্ঘদিন স্থানীয় আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে দূরে আছেন বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন মোল্লা, সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট ড. মোমতাজ উদ্দীন আহমেদ মেহেদী, রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রহমান আকন, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা নাজমুল আহসান চৌধুরী পিন্টু, গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি আমানত হোসেন খান, গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমান আরিফ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন।

এদের অনেকেই উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একক নেতৃত্ব মেনে নিতে পারছেন না। অনেকের ধারণা, বর্তমান এমপি সিমিন হোসেন রিমি যদি আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান এবং দ্বন্দ্বের অবসান না হয়, তাহলে এসব নিষ্ক্রিয় নেতার অনেকেই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন না।

কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা ও আমানত হোসেন খান দলীয় মনোনয় চাইতে পারেন বলে জানা যায়। এছাড়া তাজউদ্দীন আহমদের ভাগিনা বাংলাদেশ কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির উপদেষ্টা ও মরিয়ম ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শিল্পপতি আলম আহমেদ মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন। তিনি নির্বাচনী এলাকায় প্রতি সপ্তাহেই আসছেন। কাপাসিয়ায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন, গণসংযোগ করে যাচ্ছেন।

আমানত হোসেন খান বলেন, কাপাসিয়ায় আওয়ামী লীগের অবস্থান সব সময়ই সুসংহত ও শক্তিশালী। নেত্রীর নির্দেশে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু যখনই নেত্রীর নির্দেশনা অমান্য করে বিশেষ ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা দলীয় কোন্দলে জড়িয়েছি তখনই আমাদের বিপর্যয় হয়েছে।

১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মিণী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন দলীয় কোন্দলের কারণে বিএনপি প্রার্থী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহর কাছে হেরে ছিলেন। বর্তমানে কাপাসিয়ায় আওয়ামী লীগে দলীয় কোন্দল আরও ঘোলাটে হয়েছে।

এমপি সিমিন হোসেন রিমির নীরব ভূমিকার কারণেই তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। আগামী নির্বাচনে গৃহবিবাদ ভোটের ফলাফলে বড় রকমের প্রভাব ফেলবে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সফলভাবে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি, জাতীয় সংসদে সোহল তাজ ও সিমিন হোসেন রিমির প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।

বিএনপির সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হয়ে জীবনের সংকটাপন্ন মুহূর্তে দলের সভানেত্রীর আর্থিক সহায়তায় সুস্থ হয়ে এখন মাঠে আছি। আগামী নির্বাচনে আমি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী।

অপরদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জানান, এমপি সিমিন হোসেন রিমি কাপাসিয়ায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। এগুলোর মাঝে ৩টি মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র, মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত জোহরা তাজউদ্দীন নার্সিং কলেজ, টেক্সটাইল কলেজ, কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ৪০টি নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন উল্লেখযোগ্য।

আ স ম হান্নান শাহ এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর শীতলক্ষ্যায় সেতু নির্মিত হয়। উন্নয়নের গতি ও ছোঁয়া লাগে এ আসনে। ১৯৮৫ সালের পর কাপাসিয়ায় বিএনপির রাজনীতিতে একক ও নিরবচ্ছিন্ন নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক পাটমন্ত্রী আ স ম হান্নান শাহ।

বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করেন, আগামী নির্বাচনে হান্নান শাহ পরিবারের বাইরে থেকে কেউ মনোনয়ন পাবেন না। উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন হান্নান শাহর ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নানের একক নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে। ১০ সেপ্টেম্বর গাজীপুরে দলীয় মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে শাহ রিয়াজুল হান্নানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জামাল উদ্দিন আহমেদ এবার দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানান। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে দল আমাকে মনোনয়ন দিলেও পরে তা হাইজ্যাক হয়ে যায়। বর্তমান কাপাসিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি শ্রমিক সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আজিজুর রহমান পেরাও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে তার সমর্থকরা জানান।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি খলিলুর রহমান জানান, দলের সাংগঠনিক অবস্থান ঠিকই আছে। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা ও পুলিশি আতঙ্কে অনেকেই আত্মগোপনে ও নিশ্চুপ। নির্বাচনকালীন সময়ে পরিবেশ যদি স্বাভাবিক হয়। তাহলে বিএনপির সব নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।

১৪ দলের শরিক গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের লোক। কাপাসিয়ার মানুষ এতদিন কাক্সিক্ষত জনপ্রতিনিধি পাননি। সেই হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই এবার যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবেন।

মনোনয়ন প্রশ্নে কাপাসিয়া আওয়ামী লীগে কিছুটা কোন্দল রয়েছে। তাই জোটের পক্ষ থেকে শরিক দলকে মনোনয়ন দেয়া হলে আমি নির্বাচন করব। তিনি এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ করছেন।

জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয় চাইবেন উপজেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সামসুদ্দিন খান, জাতীয় ছাত্র সমাজ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন জয় ও আনোয়ারা কবির। মনোনয়ন চাইবেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মানবেন্দ্র দেব। বর্তমানে তিনি সিপিবির ঢাকা মহানগর কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মো. নুরুল ইসলাম সরকারও গণসংযোগ করছেন।

সর্বশেষ খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by