logo

শনিবার ২০ অক্টোবর ২০১৮, ০৫ কার্তিক ১৪২৫, ০৯ সফর ১৪৪০

মিল্কভিটায় গরুর জন্য বরাদ্দ ৪৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ
২০ অক্টোবর, ২০১৮
নিউজ ডেস্ক
এক বছরে মিল্কভিটার সমবায়ী খামারিদের প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। আর গত পাঁচ বছরে আত্মসাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। খামারিদের জন্য এই টাকা ব্যবহারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর কোনও প্রমাণ নেই।

ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (সিডিএফ) ও শেয়ার বাবদ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করছে মিল্কভিটা। কিন্তু এর সুফল পাচ্ছেন না খামারিরা। তারা জানেনও না, এই অর্থ কার পকেটে যায়, আর তা দিয়ে কী করা হয়? খামারি, সমবায়ী, পশু চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এই উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে। অথচ পশু চিকিৎসার জন্য খামারিরা প্রতিবার সেবা পেতে ব্যয় করছেন ১০০ থেকে ১০০০ টাকা। আর শেয়ার কী জিনিষ, এতে কার লাভ— কার ক্ষতি, তাও জানতে পারেননি সাধারণ খামারিরা।
সমিতির নামে শেয়ার সার্টিফিকেট

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন দেশের সবচেয়ে বড় সমবায় প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা বছরে ৯ কোটি লিটারেরও বেশি দুধ খামারিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে। বর্তমানে প্রতি লিটার দুধ মান অনুযায়ী ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দরে খামারিদের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে। দুধ কেনার সময় প্রতি লিটারে সিডিএফ ও শেয়ার বাবদ খামারিদের কাছ থেকে ১ টাকা ৫ পয়সা করে কেটে রাখে মিল্কভিটা। এর মধ্যে ৪০ পয়সা শেয়ার ও ৬৫ পয়সা সিডিএফ বাবদ কেটে রাখা হয়।

বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড-মিল্কভিটার ব্যবস্থাপনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল হামিদ লাবলু বলছেন, স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ চলছে। খামারিদের যা কিছু প্রাপ্য তাও বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সিডিএফ ও শেয়ারের হিসাব খামারিদের বুঝিয়ে দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি। চিকিৎসা, প্রজনন, ভ্যাকসিনেশনসহ নানা সুবিধা খামারিরা পাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
দুধের বিল

সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার লিটার দুধ কেনে মিল্কভিটা। ৪০ থেকে ৪৫ টাকা লিটার দরে এই দুধ কেনা হয়। এর মধ্যে শেয়ার বাবদ প্রতি লিটারে কেটে রাখা হয় ৪০ পয়সা করে। সেই হিসাবে প্রতিদিন সমবায়ী খামারিদের কাছ থেকে কেটে রাখা হয় এক লাখ টাকা। আর মাস হিসাবে ৭৫ লাখ লিটার দুধ কিনে ৩০ লাখ টাকা এবং বছর হিসাবে ৯ কোটি লিটার দুধ কিনে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা কেটে রাখা হয়।

১৯৭৩ সালে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীতে যাত্রা শুরু করে মিল্কভিটা। খামারিরা বলছেন, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই শেয়ার বাবদ কোনও লাভ বা লোকসানের হিসাব পাননি তারা। লাভ-লোকসানের হিসাব দেওয়া না হলেও সমবায়ীদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় শেয়ার সার্টিফিকেট।

ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড-সিডিএফ বাবদ লিটার প্রতি কেটে রাখা হয় ৬৫ পয়সা করে। সেই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার লিটার দুধ কিনে কেটে রাখা হয় একলাখ ৬২ হাজার টাকা। আর মাস হিসাবে ৭৫ লাখ লিটার দুধ কিনে ৪৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং বছর হিসাবে ৯ কোটি লিটার দুধ কিনে ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কেটে রাখা হয়।
দুধের বিল

খামারিদের অভিযোগ, সিডিএফ’র আওতায় রয়েছে পশু চিকিৎসা, ভাকসিনেশন ও ঋণ প্রকল্প। কিন্তু গত পাঁচ বছর যাবৎ সিডিএফ ফান্ডের কোনও সুবিধাই পাননি তারা। সিডিএফ’র জন্য কেটে রাখা টাকা কোথায় যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমবায়ীরা।

শেয়ার কেনা এবং সিডিএফ বাবদ বছরে ৯ কোটি লিটার দুধ কিনে কেটে রাখা মোট টাকার পরিমাণ ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। গত পাঁচ বছরের হিসাবে এই টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

ভোক্তা পর্যায়ে যে তরল দুধ প্রতি লিটার ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, সেই দুধের উৎপাদককে প্রতি লিটার বিক্রি করতে হয় মানভেদে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দামে। দুধ সংগ্রহ, পরিমাপ, ফ্যাট নির্ধারণ থেকে শুরু করে সংস্থার ক্রয়-বিক্রয় প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম ও লুটপাট সম্ভাবনাময় এ প্রতিষ্ঠানটিকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

তথ্য বলছে, প্রাথমিক সমবায় সমিতির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দুধ সংগ্রহ করে মিল্কভিটা। গ্রামীণ প্রাথমিক দুগ্ধ সমিতির সদস্য হতে হলে অন্তত একটি দুধেল গাই থাকতে হবে। কিনতে হবে ১০ টাকার একটি শেয়ার এবং ভর্তি ফি দিতে হবে একটাকা। সদস্য পদ টিকিয়ে রাখতে বছরে অন্তত ১৫০ লিটার দুধ সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক।

মিল্কভিটার আওতায় রয়েছে মোট ৩ হাজার ৮৪টি প্রাথমিক সমবায় সমিতি এবং ২ হাজার ২১১টি নিবন্ধিত কেন্দ্রীয় সমিতির ইউনিয়ন। এগুলোর সদস্য সংখ্যা একলাখ ২৩ হাজার ৫৬৮ জন। মিল্কভিটা ৪৩টি চালু কারখানার মাধ্যমে দেশের ৩২টি জেলা ও ১৩৭টি উপজেলায় সমবায়ী কৃষকদের কাছ থেকে বছরে ৯ কোটি লিটারেরও বেশি দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে। সংগ্রহ করা দুধ থেকে পাস্তরিত তরল দুধ, মাখন, ঘি, ক্রিম, মিষ্টি দই, টক দই, লাবাং, রস মালাই, চকলেট, ফ্লেবারড মিল্ক, আইসক্রিমসহ ১৭টি দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদিত হয়ে মিল্কভিটার নামে দেশব্যাপী বাজারজাত হয়।
দুধের বিল

উল্লাপাড়ার কয়রা খামারপাড়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী জানান, সমবায়ী কৃষকদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও তা দেওয়া হয় না। গবাদি পশুকে ভ্যাকসিনও দেয় না মিল্কভিটা। আগে গরু কেনার জন্য ঋণ দেওয়া হতো। এখন তাও দেওয়া হয় না। মোহাম্মদ আলী নিজেও একজন খামারি। পাঁচটি গরুর মালিক তিনি। শুরুতে অনেক আশা নিয়ে খামার শুরু করলেও এখন তিনি হতাশ।

খামারপাড়ার সমবায়ী কৃষক জামাল মিয়া জানান, তার খামারে গরু আছে ১০টি। ১৩ বছর আগে খামার শুরু করেন। মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ প্রতি সপ্তাহে প্রায় একশ’ লিটার করে দুধ কিনছে তার কাছ থেকে। জামাল জানান, প্রতি লিটার দুধে শেয়ার বাবদ ৪০ পয়সা এবং সিডিএফ বাবদ ৬৫ পয়সা হিসেবে তাদের কাছ থেকে এক টাকা পাঁচ পয়সা করে কেটে রাখা হয়। অথচ এর কোনও সুবিধাই তিনি পান না।

আরেক সমবায়ী কৃষক আছিয়া খাতুন জানান, শেয়ার বা সিডিএফ কী তা তিনি বোঝেন না। মিল্কভিটার কর্মকর্তাদের কাছে এ নিয়ে জিজ্ঞাসা করেও জবাব পাননি। আছিয়া প্রশ্ন তোলেন, ‘লিটার প্রতি ১ টাকা ৫ পয়সা কেটে রাখছে, অথচ সুবিধা দিচ্ছে না,কিন্তু কেন?’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিল্কভিটার কয়েকজন কর্মকর্তা ও চিকিৎসক জানান, সরকার যায় সরকার আসে। পরিবর্তন হয় মিল্কভিটার ব্যবস্থাপনা কমিটির। শুধু ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না মিল্কভিটার প্রাথমিক সমবায় সমিতির সদস্যদের। এই সদস্যরাই মূলত প্রতিষ্ঠানটির প্রাণ। আর সমবায় আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিকও তারা।

সর্বশেষ খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by