logo

শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

নির্বাচন বর্জনের ‘উসকানি’ দেখছে ঐক্যফ্রন্ট
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দেখছে সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন বর্জনের ‘উসকানি’। একই সঙ্গে সংশয় প্রকাশ করেছে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা নিয়ে।
১৬ নভেম্বর, ২০১৮
নিউজ ডেস্ক
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সব ঠিকঠাক থাকলে ৩০ ডিসেম্বর ভোট অনুষ্ঠিত হবে। শুরুতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকলেও পরবর্তী সময়ে ‘আন্দোলনের অংশ হিসেবে’ এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকতে পারা নিয়ে সংশয় রয়েছে জোটের নেতাদের। তারা মনে করছেন, ‘উসকানি’র মাধ্যমে তাদের নির্বাচনে আসতে দিতে চায় না ক্ষমতাসীনরা।

বিএনপির মনোনয়নপত্র বিক্রির মধ্যেই ১৪ নভেম্বর, বুধবার দুপুর ১টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। এই সংঘর্ষ পূর্বপরিকল্পিত ও সরকারের মদদে হয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তাদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করে বিরোধীদের নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায় সরকার।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল। দাবি আদায়ে আন্দোলনের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু জনভিত্তিহীন এই (আওয়ামী লীগ) সরকারই চাচ্ছে না জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক; বরং তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ফের একতরফা বিজয় সুনিশ্চিত করতে চায়।’

‘নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যেতে বিএনপির ওপর দোষ চাপাতে নানান ধরনের উসকানিমূলক কথাবার্তা ও সহিংসতার আশ্রয় নিচ্ছে। তবে আমাদের স্পষ্ট কথা, দাবি মেনে না নিলে এই সরকারের শেষ রক্ষা হবে না।’

সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সরকারের সদিচ্ছার অভাব দেখছেন মোশাররফ। কিন্তু এরপরও বিএনপি ও জোট নির্বাচনে অংশ নিতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনি তারিখ ঘোষণা করা হলেও সেটা চূড়ান্ত নয়। আমরা নির্বাচন পেছানোর জন্য এক মাস সময় চেয়েছি, আবেদন করেছি। তারা (নির্বাচন কমিশন) এক সপ্তাহ পিছিয়েছে। কাজেই আবার যে তারা নির্বাচন পেছাবে না, তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না।’

‘কারণ এবার কোনো ষড়যন্ত্রই বিএনপিকে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারবে না। জনগণকে সাথে নিয়েই অবৈধভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর জন্য রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনে সরকারকে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হবে। কেননা আমি মনে করি, সরকারও তা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পেরেছে।’

বিএনপির কার্যালয়ের সামনের সংঘর্ষে সরকারের হাত দেখছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, এই হামলার পর পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য সরকারি দলের হাত আছে। অসমর্থিত কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য খবরে জানা গেছে যে, যুবলীগ, ছাত্রলীগের কর্মীরা হেলমেট পরে, সেই যে হেলমেট বাহিনী আমরা কোটা আন্দোলনের সময় দেখেছিলাম, সেই বাহিনী নয়াপল্টনে তৎপর ছিল। আমরা এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করছি ও নিন্দা জানাই৷’

‘আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি, সরকার চেষ্টা করছে, বিরোধী দল যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে, সেই উসকানি দিচ্ছে। আমরা এর প্রতিবাদ করব, ধৈর্য ধরব। আমাদের সিদ্ধান্ত সব রকমের বাধা উপেক্ষা করে নির্বাচন করব। সেই নির্বাচনে একটা ভোট বিপ্লব হবে এই স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে।’

১৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচন পেছানোর দাবি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য নয়; বরং বানচালের জন্য। পল্টনের সংঘর্ষ বিএনপির সেই নীলনকশারই অংশ।’

ওবায়দুলের উল্লিখিত বক্তব্যের বিপরীত কথাবার্তা গত কয়েক দিন ধরেই বলে আসছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তারা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন ও বিরোধীদের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকারের পাশাপাশি ইসির সদিচ্ছারও অভাব দেখছেন।

ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের মতে, ইসি এখন পর্যন্ত একচোখা নীতিতেই চলছে। সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি তফসিল ঘোষণার পরও নিরপেক্ষ ভূমিকায় যেতে পারছে না। তফসিল ঘোষণার পরও সারা দেশে বিএনপিসহ বিরোধী দল ও জোটের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এমনকি জামিনে থাকা নেতাকর্মীদের পর্যন্ত গ্রেফতার করা হচ্ছে।

ঐক্যফ্রন্টের এক নেতা প্রিয়.কমকে জানান, ১৪ নভেম্বর পুলিশকে চিঠি দিয়েছে ইসি। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র উত্তোলন ও জমা দেওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল শোডাউন বা জমায়েত করতে পারবে না। অথচ এতদিন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এমন ভিড় থাকলেও ইসির পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগের দাবি নিয়ে ইসিতে যান বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তারা সেখানে ইসির ‘একচোখা নীতি’র বিষয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘তফসিল ঘোষণা হলেও সবার জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি ইসি। এমনকি ইভিএম ব্যবহারে বিরোধিতা করা হলেও তাতেও অনড় রয়েছে কমিশন। এসব বিষয়ে সমাধানে আসতে নির্বাচন অন্তত এক মাস পেছানো জরুরি বলে বিএনপি মনে করছে। কারণ একাদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চারদিকে উদ্বেগ, আতঙ্ক–কী ঘটতে যাচ্ছে নির্বাচন নিয়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে, এখন নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির গুরুদায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপরই। নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত যা করেছে, তাতে বিরোধী দল তো নয়ই, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক, এমনকি সাধারণ মানুষও এ কমিশনের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না।’

‘এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিরোধী দল নির্বাচনে আসার ঘোষণা দিলেও নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি না হলে তারা যেকোনো মুহূর্তে নির্বাচন বয়কট এবং এর সঙ্গে প্রতিরোধের ডাকও দিতে পারে। এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে খোদ সরকারের মধ্যেই।’

বুধবার নাইকো দুর্নীতি মামলার হাজিরার সময় নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আদালতের এজলাসে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, ‘একদিকে মামলা চলবে, অপরদিকে তারা (ক্ষমতাসীন দল) নির্বাচন করবে—এটা তো হতে পারে না।’

বর্তমান সিইসির অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘সিইসি কে এম নূরুল হুদার ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত হওয়া ছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ আনুকূল্যের কারণে এই রাজনীতি থেকে তার বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ ইতিপূর্বে এত কম যোগ্যতাসম্পন্ন কাউকে সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অথচ নূরুল হুদা সর্বশেষ চাকরি করেছেন যুগ্ম সচিব পদে।’

‘এই পদে থাকাকালেই বিএনপি সরকারের সময় তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। এরপর একপর্যায়ে স্বাভাবিক অবসরের সময়ও শেষ হয় তার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে একই প্রজ্ঞাপনে অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ কাগজে-কলমে সচিব হলেও বাস্তবে তিনি সাবেক যুগ্ম সচিব। এসব কারণে এই সিইসির পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচনের উপযোগী লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা আদৌ সম্ভব হবে কি না, দেশের জনগণ সন্দিহান।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান মনে করেন, সরকার উসকানি দিলেও বিএনপি তার ফাঁদে পা দেবে না। তিনি প্রিয়.কমকে জানান, এ মুহূর্তে কোনো রকমের সহিংসতার পক্ষে নয় বিএনপি। কোনো উসকানিতে পা দেবে না দলটি। দলের নেতারা মনে করছেন, নিয়মতান্ত্রিক পথেই বর্তমান সরকারের পতন ঘটবে।

২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ জোটের নির্বাচনে আসা নিয়ে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জোটের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব এবং সে ক্ষেত্রে বলতে চাই, ২০ দল নির্বাচনে আসুক, সরকার সেটা চায় কি না, তাতে সন্দেহ আছে।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন হবে কি না, আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব কি না, সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সরকারের ওপর। কারণ এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই।’

সর্বশেষ খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by