logo

সোমবার, ৪ মে ২০১৫ . ২১ বৈশাখ ১৪২২ . ১৪ রজব ১৪৩৬

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
০৪ মে, ২০১৫
আবদুল্লাহ আল মামুন নিলয়


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে সক্রিয় যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল যেখানে কোনো নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এছাড়া যারা যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলে রয়েছেন তারাও নারী সদস্য। যে কারণে অনেকে নির্ভয়ে অভিযোগ দিতে পারেন।এভাবেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে

১৯৯৮ সাল। ধর্ষকের শাস্তির দাবিতে উত্তাল ক্যাম্পাস। শহীদ সালাম বরকত হলের আবাসিক ছাত্র এবং নাটক ও নাট্যতত্ত্বের শিক্ষার্থী ছিলেন জসীম উদ্দীন মানিক। তখন বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত ক্যাম্পাস। আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ ছিল সেদিন। ম্যাচ শুরুর আগেই মিষ্টির প্যাকেটে ভরে গেছে সালাম বরকত হলের কমন রুম। মানিকের নির্দেশে পুরো হলে চলছে সেই মিষ্টি বিতরণ। খেলা শুরুর আগেই মানিকের অনুগত একজন ঘোষণা দিলেন আমাদের মানিক ভাই আজ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন। তাই সবার জন্য মিষ্টির ব্যবস্থা। সবার প্রশ্ন, কিসের সেঞ্চুরি ? কিন্তু কেউ মুখ খুলছে না প্রশ্ন শোনার পরও। মানিককে একজন সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন ভাই কিসের সেঞ্চুরি ? তখন তিনি বললেন, একশ জন নারী আমাকে ‘আই লাভ ইউ’ বলেছে তো, তাই সেলিব্রেট করছি। কিন্তু  জসীম উদ্দীন মানিকের সেঞ্চুরিতে মিষ্টি বিতরণের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। কারণ যারা তার যৌন সন্ত্রাসের স্বীকার হয়েছেন এতক্ষণে তাদের কাছে তার এই সেঞ্চুরির খবর পৌঁছে গেছে। আগেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত কিছু ধর্ষণের খবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সেই খবরের সুবাদে চাপা গুঞ্জন চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। নির্যাতিতদের মধ্যে চলমান চাপা ক্ষোভ যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ হতে পারে এমন অনুমান হচ্ছিল কয়েকদিন ধরে। জসিম উদ্দীন মানিকের সেঞ্চুরিও ততদিনে মিডিয়া পাড়ার হটকেক। তখন বিভিন্ন হল থেকে ছাত্রীরা মিছিল নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের দিকে আসতে থাকে। তাদের অনেকের হাতে ছিল লাঠিও। তারা সেখানে গিয়ে ‘জাহাঙ্গীরনগরের আঙ্গিনায়, ধর্ষকদের ঠাঁই নাই’ এমন স্লোগান দেয়া শুরু করে। তখন  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন আলাউদ্দিন আহমেদ। তার কাছে আগেই তিনজন মেয়ের ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছিল। প্রশাসনিক ভবনের সামনে মিছিলের কাছে এসে উপাচার্য তাদের কথা শুনলেন। তখন তিনি বললেন, আমি তোমাদের কথা মতো ব্যবস্থা নেব তবে তার আগে তোমাদের কাছে একটা জিনিস জানতে চাই? আমাদের কাছে যে অভিযোগ জমা পড়েছে সেখানে অভিযোগকারীর নাম আছে কিন্তু সে ভিকটিমের নাম নাই। এভাবে আমরা কিভাবে বিচার করবো। তোমরা আমাকে বল, তোমাদের মধ্যে কে ধর্ষিতা ? তখন সমাবেশ থেকে সব ছাত্রী সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘স্যার, আমরা সবাই ধর্ষিত, আমরা ধর্ষকের বিচার চাই’। থমকে গেলেন ভিসি। নির্বাক হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তখন তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে ঘোষণা দিলেন আমরা তোমাদের অভিযোগের ভিত্তিতে নতুন প্রক্টরের কাছে দায়িত্ব দিয়েছি। এছাড়া ক্যাম্পাসে ধর্ষণের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংস কমিটি গঠন করেছি। যেখানে চারজন নারী সদস্য রয়েছে। ভিসির ঘোষণা শেষে সবাই করতালি দিয়ে তা স্বাগত জানান। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের পঁয়ত্রিশতম দিনে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংস কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে সিন্ডিকেট সভা শুরু হয়। সেই দিনও সিন্ডিকেট সভার বাইরে ছাত্রীরা মিছিল নিয়ে অবস্থান করেন। সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত ভিসি সবার সামনে ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী জসীম উদ্দীন মানিকসহ সাতজন অভিযুক্ত হয়েছে ধর্ষণের জন্য। আর ছয়জন অভিযুক্ত হয়েছে ধর্ষণেসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সহযোগিতার জন্য, কমিটি তেরোজনকেই শাস্তির সুপারিশ করেছে। এই তেরোজনের বিরুদ্ধে একাডেমিক শাস্তিসহ মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিন দিন পর আবার সিন্ডিকেট সভা ডাকা হয়েছে। ওই দিন একাডেমিক শাস্তি চূড়ান্ত করা হবে। তিন দিন পর সিন্ডিকেট সভায় জসীম উদ্দিন মানিকের আজীবন ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। অভিযুক্ত তেরোজনের মধ্যে অন্যদের তিন বছর, দুই বছর ও একবছর মেয়াদে ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। এ হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল আলোচিত ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের একটি ঘটনা। সম্প্রতি পুরো দেশে বর্ষবরণে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। যেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো ১৭ বছর আগে এর চেয়ে আরো ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু যারা এর শিকার হয়েছেন তারা কখনো নিজেদের দুর্বল মনে করেননি। চুপ করে থাকেননি, তারা সোচ্চার হয়েছেন। করেছেন এর প্রতিবাদ। এটা অবশ্যই এক দুর্দান্ত সাহসের কাজ। কারণ তারা একজন শক্তিশালী সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। প্রত্যেক জায়গা থেকে গড়ে তোলা হয়েছে প্রতিবাদ। পরবর্তীতে ঠিকই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এই যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাদের ছাত্রত্ব বাতিলসহ আইনানুগ বিচার করেছেন। এটা ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মানিকের ঘটনার প্রতিবাদ আমাদের একটা পথনির্দেশনা দিয়েছে। বর্ষবরণের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসিতে সংঘটিত যৌন নিপীড়নের ঘটনা কিংবা যেকোনো স্থানে যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলোতে যদি প্রতিরোধ গড়া যেত তাহলে আমি নিশ্চিত এই দুরাচার আরো কমে যেত। প্রতিরোধ-প্রতিবাদ করতে হবে নির্যাতিতদের বাইরে রেখে। যা সতেরো বছর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছিল। তারা সম্মিলিতভাবে যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। যখন তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় কে ধর্ষিত? তখন তারা বলেন আমরা সবাই ধর্ষিত। এর মানে একজন আক্রান্ত হলে তার দায় সমাজের সবার জন্য। তাই বর্ষবরণ যেমন আমাদের সকল বাঙালির প্রাণের উৎসব তেমনি এই যৌন নিপীড়নের দায়ও আমাদের সমাজের। কারণ আমরা যদি আমাদের সমাজের অংশ নারীদের উৎসবে নিরাপত্তা না দিতে পারি। তাহলে আমাদের সমাজে উৎসব পালনের ব্যর্থতার দায়ভার নিতে হবে। এছাড়া দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও বর্ষবরণে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছিল। যা আবার একজন আদিবাসী নারীর ওপর। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়  সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। যে নারী এর শিকার হয়েছেন তিনি চুপ করে তা হজম করেননি, সে তার ওপর চালানো সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিচার চেয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও সাময়িকভাবে তার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় আটজনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছেন। যতদিন পর্যন্ত এর তদন্ত শেষ না হয় ততদিন পর্যন্ত। পরবর্তীতেও তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আবার ব্যবস্থা নেয়া হবে এমন নিশ্চয়তাও দিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে সক্রিয় যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল যেখানে কোনো নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এছাড়া যারা যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলে রয়েছেন তারাও নারী সদস্য। যে কারণে অনেকে নির্ভয়ে অভিযোগ দিতে পারেন। এভাবেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম ক্যাম্পাস যেখানে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে নিহত ছাত্র যোবায়েরের খুনিদের বিচার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। যা সম্ভব হয়েছে প্রশাসনের একান্ত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে। আর শিক্ষার্থীদেরও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের  বিরুদ্ধে রয়েছে সচেতনতা ও অবস্থান। যেজন্য এখানে গড়ে উঠেছে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ নামে সংগঠনও। যারা সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের  বিরুদ্ধে সবসময় অবস্থান নেন ও মানুষকে সচেতন করেন। এভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মতো বাংলাদেশের সকল জায়গায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেই আমাদের দেশ হবে সন্ত্রাসমুক্ত। আমাদের নারী সমাজের ওপর আর কোনো সন্ত্রাসী হায়েনার মতো হানা দিতে পারবে না। যা প্রতিহত করা সম্ভব সকলের একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।



আবদুল্লাহ আল মামুন নিলয় : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী

 


সর্বশেষ খবর

খোলা হাওয়া এর আরো খবর

    আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

    Developed by