logo

সোমবার, ২ নভেম্বর ২০১৫ . ১৮ কার্তিক ১৪২২ . ১৯ মহররম ১৪৩৭

ডুয়িং বিজনেস ২০১৬ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
০২ নভেম্বর, ২০১৫
মো. শরীফুর রহমান আদিল
গত ৩০শে অক্টোবর দেশের বিভিন্ন দৈনিকের একটি উল্লেখযাগ্য শিরোনাম ছিল রিজার্ভ নিয়ে মধুর সমস্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর। প্রতিবেদনটি যে অমূলক নয় তা গত ২৮শে অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আইএফসিও জানিয়ে দিলো বাংলাদেশে ব্যবসা পরিবেশ নিয়ে আশংকার কথা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে পরিমাণ রিজার্ভ থাকার প্রয়োজন ছিল এখন সেখানে রয়েছে তারচেয়ে ৪ গুণ বেশি। অথচ এসব টাকা তো বিনিয়োগ করার কথা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন তা বিনিয়োগ করছে না? এত বেশি রিজার্ভ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রেখে বাংলাদেশের জনগণের লাভ কি? শুধু যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা কিন্তু নয়। অন্যান্য ব্যাংকগুলোও তাদের রিজার্ভ টাকা নিয়ে বসে আছে। নিরাপত্তা আর বিভিন্ন সমস্যার কারণে ফলেও তাদের রির্জাভ টাকগুলো অলসভাবে বালিশের নিচে রেখে দিচ্ছে। অর্থাৎ তারাও বিনিয়োগ করছে না। আর বিনিয়োগ না করার পেছনে যেসব কারণ রয়েছে তা বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করর্পোরেশন (আইএফসি) স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। জাতিসংঘের এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশ সূচক নির্ধারণ করে; এ বছরও  তারা ‘বিজনেস ডুয়িং ২০১৬’ শিরোনামে ব্যবসায়িক সূচক প্রকাশ করছে। সূচকে বাংলাদেশের যে চিত্র ভেসে উঠেছে তাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক তাদের রিজার্ভ টাকা বিনিয়োগ না করার, এমনকি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এদেশকে পছন্দ না করার পেছনের কারণসমূহ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

এবার আসা যাক আইএএফসির এ প্রতিবেদনে কি ছিল।  সংস্থাটি ১০টি বিষয়েডুয়িং বিজনেস ২০১৬ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে সূচক তৈরি করে। এগুলো হলো ব্যবসায় শুরুর, অবকাঠামো কাজের অনুমোদন প্রক্রিয়া, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রাপ্তি, স¤পত্তি নিবন্ধন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা, ঋণ প্রাপ্তি, কর পরিশোধ, বহির্বাণিজ্য, চুক্তি বাস্তবায়ন ও আর্থিক অসচ্ছলতা দূরীকরণ প্রভৃতি। এবং এসব বিষয়কে ভিত্তি হিসেবে ধরে  ১৮৯টি দেশের ওপর তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে তা পরে বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যায়ন করে চূড়ান্ত সূচক তৈরি করে। এবারের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৪, যা পূর্বে ছিল ১৭২! সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভুটান, তাদের অবস্থান ৭১। অন্যদিকে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে যুদ্ধ ও জঙ্গিদমনে মার্কিন সেনা অভিযানে বিধ্বস্ত আফগানিস্তান। আর তার পাশাপাশি অবস্থান করছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। আফগানিস্তান যুদ্ধবিধ্বস্ত আর জঙ্গি সম্পৃক্ততায় সেদেশের পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যখন হুমকির মুখে তখন ব্যবসায়িক পরিবেশের এই তলানি তাদের জন্য খুব একটা কষ্টের বিষয় নয়। কিন্তু বাংলাদেশ কেন আফগানিস্তানের পাশে অবস্থান করবে? যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত পাকিস্তানের সমালোচনা করি এবং পাকিস্তানের মতো আমাদের দেশ হয়ে যাওয়ার আশংকা করি, সেই পাকিস্তানের অবস্থানও আমাদের থেকে অনেক উপরে তথা ১৪১!

এতে তালিকার শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। এরপরে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড আর ডেনমার্ক। আর একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, এসব দেশে কেবলমাত্র ব্যবসা পরিবেশ যে ভালো তা কিন্তু নয়। বরং তাদের এসব দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দুর্নীতি কোনোটিরই উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না। ফলে বিদেশিরাসহ দেশীয় উদ্যোক্তাদের এসব দেশে তাদের বিনিয়োগ লক্ষ্য করা যায়। ফলে সেসব দেশে বেকারত্বের সমস্যাও দেখা যায় না। সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার দিকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান, ব্যবসার তহবিল ব্যয় কমানো, কম সুদে ঋণ দেয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকে ২৭ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ জমা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রার মানের সঙ্গে আমাদের মুদ্রার মান অনুকূলে রাখার প্রভৃতি উদ্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্যবসা পরিবেশ গড়ে তোলার দিক থেকে একদম তলানিতে অবস্থান করছে। যদিও পয়েন্ট কিছুটা বেড়েছে কিন্তু রেটিং বৃদ্ধি পায়নি অর্থাৎ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ পাল্লা দিয়ে ব্যবসায়িক অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টির সূত্র ধরে বলা যায়, ‘পূর্বে যেসব দেশ বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে ছিল সেসব দেশ এখন বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে গেছে। কিন্তু ওসব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশ এগুতে পারছে না’। অর্থাৎ অন্যান্য দেশ যেভাবে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করছে বাংলাদেশ সেভাবে উন্নতি করতে পারছে না। আর না পারার অন্যতম কারণ হলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও প্রশাসনের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। একটি জরিপে দেখা গেছে, ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি বিভিন্ন দফতরে ঘুষ দিতে হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের কাজ দ্রুত এগিয়ে গেলেও যে সেক্টরে সবচেয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজিটালাইজড করার প্রয়োজন ছিল সেই ভূমি অফিস এখনও পুরোপুরি ডিজিটালাইজডের আওতায় আসেনি। বাংলাদেশ গত কিছুদিন আগে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা উন্নয়ন তথা এমডিজি পুরস্কার অর্জন করেছে, আবার টেশসই উন্নয়নের নতুন লক্ষ্যমাত্রা তথা এসডিজি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির চাকা সচল করা ছাড়া কি এসব লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে? বিশ্বব্যাংক কর্তৃক উপস্থাপিত রিপোর্ট অনুযায়ী  বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান ও এক নম্বার সমস্যা হলো বিদ্যুৎ ঘাটতির সমস্যা। স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১৮৯টি দেশের মধ্যে ১৮৯তম !

তবে একথা সত্যিই যে, বাংলাদেশ সরকার ব্যবস্থার ভৌত উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষভাবে জোর দিচ্ছে কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরিতে সরকার সে পরিমাণ নজর দিচ্ছে না। যদিও কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের রাজনীতি ব্যবসায়ীদের দখলে বলে সেøাগান উঠেছিল। বাংলাদেশ সরকার যখন বহির্বিশ্বকে এদেশে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানাচ্ছে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ব্রান্ডিং করার বিষয়টিও বিবেচনা রেখেছে, ঠিক এ  সময়ে বিশ্বব্যাংকের উপস্থাপিত প্রতিবেদন বাংলাদেশের জন্য সত্যিই বেদনাদায়ক। দেশে দিন দিন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু সে হিসেবে চাকরির বাজার বাড়ছে না। ফলে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিত্যিক হারে। বর্তমানে দেশে শিক্ষিত কিন্তু বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৭.৫ লাখ। ফলে এসব জনগোষ্ঠী দেশে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরিতে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি বিদেশিদের এদেশে বিনিয়োগ করলে এসব বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষেত্রের সুযোগ সৃষ্টি হতো। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের দেয়া রিপোর্টটি বাংলাদেশ সরকারকে যে শুধু হতাশ করেছে তা নয়।

বরং শিক্ষিত এসব বেকার জনগোষ্ঠীকেও হতাশ করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদেশিদের এদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হলে অবশ্যই বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত সমস্যাগুলো সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে। অন্যথায় বিদেশিদের এদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে যে ব্রান্ডিং করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে তাতে খুব একটা সুফল আসবে না। কেননা, বিনিয়োগকারীরা কোন দেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে প্রথমেই এসব সূচকের দিকে তাকায়। অন্যদিকে কিছুদিন আগে বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বীকৃতির আগেই বাংলাদেশ থেকে  নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে পরিচিত করানো হয়েছে।  এবং মধ্যম আয়ের দেশে বাংলাদেশ ধাবিত হচ্ছে বলে প্রচার করানো হয়েছে। এতেও বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ঋণদাতা সংস্থা, যেমন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কাইল পিটারস বাংলাদেশে তাদের দেয়া ঋণের সুদের হার বাড়াতে চায়, যা বাংলাদেশে বর্তমান সার্ভিস চার্জ হিসেবে মাত্র ১ শতাংশ আদায় করে এবং পুরো টাকা পরিশোধ করে ৪০ বছরে। কিন্তু নিম্নœ মধ্যবিত্ত আয়ের দেশ উল্লেখ করায় বিশ্বব্যাংক, জাইকাসহ অন্যান্য দাতা সংস্থা তাদের দেয়া ঋণের ওপর সুদের হার বাড়াতে চাপ দিচ্ছে। আর যদি বিশ্বব্যাংক, জাইকাসহ অন্যান্য দাতারা সুদের হার বাড়ায় তবে দেশীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এর বিরাট প্রভাব পড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নতি করতে হলে সরকারকে অবশ্যই অর্থনৈতিক জোনের কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়াও শিল্পাঞ্চলের জন্য আলাদা বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা করতে হবে এবং গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করতে হবে। এতে বৈদেশিক বাণিজ্যেও খরচ ও সময় উভয়ই বাঁচবে। ফলে ব্যবসায়িক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরো বাড়বে।

 

লেখক : কলামিস্ট; প্রভাষক, দর্শন বিভাগ, ফেনী সাউথ ইস্ট ডিগ্রি কলেজ, ফেনী

সর্বশেষ খবর

খোলা হাওয়া এর আরো খবর

    আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

    Developed by