logo

বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ . ১২ ফাল্গুন ১৪২২ . ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৭

ভাষার লড়াইয়ে শেখ লুৎফর রহমান
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
গৌতম বাকালী
বাংলাদেশের গণসংগীতের  দিকপাল শেখ লুৎফর রহমান একাধারে উচ্চাঙ্গ ও নজরুল সংগীত শিল্পী ও গবেষক হিসেবেই এ দেশে বেশি পরিচিত। কিন্তু এদেশের ভাষার লড়াইয়ে শিল্পীর যে বিরাট ভূমিকা রয়েছে তা অনেকের কাছেই অজানা। একুশ আসে একুশ যায় কিন্তু কোন টিভি চ্যানেলে কিংবা কোন পত্রপত্রিকায় ভাষা আন্দোলনে শেখ লুৎফর রহমানের ভূমিকার কথা শোনা যায় না। মহিমান্বিত এ শিল্পীর জন্ম ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ফেব্রুয়ারি, সাতক্ষীরার নিকটবর্তী সুলতানপুর,   শেখপাড়ায়। মাত্র ৯ মাস বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার পায়ের শক্তি হারিয়ে   ফেলেন। কিন্তু শারীরিক পঙ্গুত্ব তাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। বাবা স্কুল শিক্ষক শেখ আব্দুল হক ছিলেন সংগীতপাগল লোক; তবে   শৈশবে কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র   রেকর্ড শুনে সংগীতের প্রতি অনুরাগ জন্মে শেখ লুৎফরের। সাতক্ষীরা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উমাপদ ভট্টাচার্য কিশোর লুৎফরকে নিয়ে  গেলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের কাছে। নজরুল তার গান শুনে বলেছিলেন একদিন অবশ্যই তুমি শিল্পী হবে। স্থানীয় সঙ্গীত শিক্ষকদের কাছে কিছুটা তালিম   নেয়ার পর, উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি কলকাতা চলে যান। কলকাতা যাওয়ার পর শেখ লুৎফর বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ পশুপতি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তালিম নিতে শুরু করেন। কিছুদিন পর আবার ফিরে আসেন সাতক্ষীরা। ইতোমধ্যে শিল্পী হিসেবে সাতক্ষীরা   থেকে খুলনা সর্বত্রই খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তার। ১৯৩৯ সালে আবার  কোলকাতায় যান তিনি। এ সময় বিচারপতি নাসিরউদ্দিনের ছেলে ব্যারিস্টার মাসুদ সাহেবের বাসায় থাকতেন তিনি। মাসুদ সাহেব একদিন তাকে নিয়ে   গেলেন   কোলকাতার ঝাউতলায় বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক এস ওয়াজেদ আলী সাহেবের বাসায়। সে বাসায়  প্রতি   রোববারে নিয়মিত সাহিত্যের আসর বসতো। এখানেই শিল্পীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটে শিল্পী আব্বাস উদ্দিন, কবি জসিম উদ্দিন,   গোলাম   মোস্তফা, অভিনেতা মমতাজ উদ্দিন আহমদ, কমরেড মুজাফফর আহমদ, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংগে। এ আসরকে তিনি মাতিয়ে   তোলেন গানে গানে। ১৯৪৩ সালে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এ সময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে ঠিক এ সময় কমরেড মুজাফফর আহমদ এর অনুপ্রেরণায় শিল্পী যোগ দেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (আইপিটিএ)। আইপিটিএ-তে এসে সাধন গুপ্ত, দেবব্রত বিশ্বাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, আব্দুর রাজ্জাক, বিনয় রায় ও এদের মতো আরো কিছু মানুষের সংস্পর্শে এসে তিনি আবিষ্কার করলেন গণমানুষের ভাগ্য  পরিবর্তনের জন্য চাই সংগ্রাম এবং  সংগ্রাম অবশ্যই হতে হবে   শ্রেণি নির্বিশেষে গণমানুষের সম্মিলিত প্রয়াসে। এভাবেই তিনি সাধারণ সংগীত শিল্পী থেকে পরিণত হলেন সত্যিকারের গণশিল্পীতে।

দেশভাগের পর চলে এলেন ঢাকায়, যোগ দিলেন ঢাকা বেতারে। হিন্দু সম্প্রদায়ের শিল্পীদের   ভাষার লড়াইয়ে শেখ লুৎফর রহমান
দেশত্যাগে ঢাকা প্রায় শিল্পীশূন্য। সে সময়ে ঢাকা তথা সমগ্র পূর্ববংগে অধিকাংশ শিল্পীরা গাইতেন আধুনিক গান। এতে করে ঢাকায় এসে তিনি খুব হতাশ হয়ে গেলেন কারণ তার হৃদয়ে ঘুমন্ত বাঙালিকে জাগানোর যে অদম্য স্পৃহা তা প্রকাশের   কোন সুযোগ পাচ্ছেন না। গান   লেখার   লোকেরও প্রচ- অভাব ছিল সে সময়। এর মধ্যে তার সাথে পরিচয় ঘটে# ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আনিছুল হক   চৌধুরীর সংগে। যিনি কিছুটা কবিতা-প্রবন্ধ লিখতেন। তাকে একদিন বললেন শুধু ঘুমপাড়ানি আধুনিক গান আর ভালো লাগছে না (নতুন কিছু লিখো। শিল্পীর অনুরোধে তিনি একটি কবিতা লিখলেন যাতে সুর দিলেন শেখ লুৎফর রহমান। গানটি ছিলো এ রকমঃ শুধু ঘুম পাড়ানী গান আজি নয়/কর্মের আহবান এলো আজ ধরাময়। সম্ভবত এ গানটি তার সুর করা প্রথম গণসংগীত। এর কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ   মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় এসে   ঘোষণা করলেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বাংলার ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতাসহ প্রতিবাদে   ফেটে পড়লো। আজকের বাস্তবতায় আমরা দেখি, ভাষা সংগ্রাম হলেও মুক্তি আজও আসেনি। শিল্পী আবদুল লতিফ এ নিয়ে দুঃখ করে বলতেন-ভাষাকে সুউচ্চ মহিমায় তুলে ধরা জাতিগুলোর তালিকায় আমাদের নাম এখনো পেছনের সারিতে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বারবারই সরকারকে বলে আসছেন রাষ্ট্রীয় সব কার্যক্রমে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে। অথচ দুঃখজনক যে আজো আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন করা সম্ভব হয়নি। শুদ্ধ বাংলা ভাষার পরিবর্তে ভাষা হয়ে উঠেছে বিকৃত। বানানরীতি নিয়েও চলছে  নৈরাজ্য। দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করতে আমাদের ব্যর্থতা এবং ভাষা নিয়ে নৈরাজ্যের স্বরূপটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টার পাশাপাশি জাতির সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা ও ভাষা বিষয়ে আমাদের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া  দরকার। বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা বাংলা হলেও এ ভাষা কেন বিপন্ন হবে সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ হাজারের কম হলে ওই ভাষাকে বিপন্ন ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করেন গবেষকরা। আমাদের দেশে বাংলা ভাষার পাশাপাশি উপজাতীয় চাকমা, মান্দি, খুসিক, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, কোচ, খাড়িয়া, হাজং, খিয়াং, খুমি ও আচিক এ দশটি ভাষাও আজ বিপন্ন হতে চলেছে। এসব ভাষা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কারণ চলতি শতকের শেষ নাগাদ বিশ্বের অর্ধেক ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো এ তথ্য জানিয়েছে আরো আগেই। বিশ্বব্যাপী যে ৭ হাজার দাপ্তরিক ভাষা রয়েছে তার মধ্যে ২ হাজার ভাষায় কথা বলে মাত্র ১ হাজার বা তার চেয়ে কমসংখ্যক মানুষ। এগুলোর মধ্যে আমাজন জঙ্গল, আফ্রিকার সাহারা, ওশেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যবহৃত ভাষাগুলো হারিয়ে যাবে।

ইউনেস্কোর বিপন্ন ভাষা প্রকল্প (ইএলপি) বলেছে, ‘অবিশ্বাস্য গতিতে ভাষাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। আর যখন তা ঘটে তা বিশ্বের একটি অনন্য দর্শন হারিয়ে যায়।’  এসবের রিুদ্ধে সংগ্রাম ছিলো আবদুল লতিফের। তিনি বলতেন,আমরা ভাষা আন্দোলন করে তাকে সুরক্ষা করেছি। এই ভাষার অযতœ কোন মতেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। শুধু ফেব্রুয়ারি মাস নয়, সারা বছর বিশুদ্ধ বাংলা চর্চাসহ অন্যান্য ভাষার প্রতি সমমর্যাদা জ্ঞাপন করে ভাষাকে সুরক্ষা করতে হবে। রক্তের দামে কেনা বর্ণমালা যাতে অযতেœ না থাকে। ভাষার বিপন্নতা রোধসহ শুদ্ধ সঠিক বানানরীতি চালু ও প্রমিত ভাষা ব্যবহারে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শিল্পী সংগ্রামী শেখ লুৎফর রহমানের হৃদয়ও ভাষা সংগ্রামের প্রশ্নে আলোড়িত হয়েছিলো প্রচ-ভাবে।  সেই সময় সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য তিনি আবার অনুরোধ করলেন আনিছুল হক   চৌধুরীকে নতুন একটা কিছু লিখে দিতে। লিখলেনও তিনি। অবশেষে তিনি   সেই কবিতাটিতে সুর দিয়ে জগন্নাথ কলেজের এক অনুষ্ঠানে   গেয়ে উঠলেন দরাজ কন্ঠে-

শোনেন হুজুর, বাঘের জাত এ বাঙালেরা/  জান দিতে ডরায় না তারা

তাদের দাবি বাঙলা ভাষা/ আদায় করে নেবেই।

ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন জাতীয়   নেতা আতাউর রহমান খান। তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে   গোটা হল ঘোরালেন। শুধু তাই নয় ঐ একই অনুষ্ঠানে গানটি প্রায় দশ বার শিল্পীকে গাইতে হয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকায় যতগুলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে তার সবগুলোতেই তাকে এ গান কয়েকবার করে গাইতে হয়েছিল। এরই মধ্যে শাষক   গোষ্ঠীর কাছে খবর চলে যায়। তাদের   লোকজন এসে তার সে গানটিসহ গানের খাতাটি   কেড়ে   নেয়। এরপর তাকে বিভিন্ন রকম ভয়ভীতি   দেখানো হয় এবং বলা হয় এ রকম গান গাইলে এদেশে থাকতে   দেয়া হবে না। কিন্তু এত রকমের হুমকি সত্ত্বেও গণশিল্পী শেখ লুৎফর তার আদর্শ ও লক্ষ্য  থেকে বিচ্যুৎ হননি। বরং এর পরপরই তিনি বিদ্রোহী কবি নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ এবং ‘কামাল পাশা’-কে সুর দিয়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেন সমগ্র ঢাকায়। ৪৮-৫২ পর্যন্ত চলমান ভাষা আন্দোলনের  বিভিন্ন সভা-সমিতি এবং  ঢাকার সমস্ত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে তার এ গণসংগীতগুলো গাওয়া হয়েছে। ১৯৫৩ সালে একুশের প্রভাত ফেরিতে গাওয়া হয়েছিল যে গানটি   সেটি ছিল  প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন-এর   লেখা মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে/ আজিকে স্মরিও তারে। এ গানটিতে সুর করেন শহীদ আলতাফ মাহমুদ ও শেখ লুৎফর রহমান দুজনে মিলে। এছাড়াও শেখ লুৎফর রহমান একুশের আরো অনেকগুলো গানের সুর করেছেন।   যেমন- ‘রক্তে আমার আবার প্রলয় দোলা/ফাল্গুনে আজ চিত্ত আত্ম ভোলা’, ‘মিনার এবার বাঙ্ময় হয়ে উঠো’, মিলিত প্রাণের কলরবে’ ইত্যাদি। ভাষার লড়াই ছিল এ দেশের একটি অন্যন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এ লড়াইয়ে গণশিল্পী শেখ লুৎফর রহমানের ভূমিকা বাঙালি চিরকাল শ্রদ্ধা সহকারে স্মরণ করবে। 

 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী

সর্বশেষ খবর

খোলা হাওয়া এর আরো খবর

    আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

    Developed by