logo

বৃহস্পতিবার, ১২ জুলাই ২০১৮, ২৮ আষাঢ় ১৪২৫, ২৭ শাওয়াল ১৪৩৯

আমি আকাশ আঁকার দলে
১২ জুলাই, ২০১৮
বিনোদন ডেস্ক
হোটেল ট্র্যানসেলভেনিয়া থ্রি: সামার ভ্যাকেশন ছবির ‘র‍্যাপ আপ পার্টি’-তে (সমাপনী অনুষ্ঠান) ওয়াহিদ ইবনে রেজা ও তাঁর স্ত্রী লিসা পারভীন

বাংলাদেশের ছেলে ওয়াহিদ ইবনে রেজা। এর আগেও হলিউডের বেশ কিছু আলোচিত ছবির ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের দলের সঙ্গে কাজ করে খবরের শিরোনাম হয়েছেন। তাঁর এবারের কাণ্ড দেখা যাবে আজ বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাওয়া হোটেল ট্রানসেলভেনিয়া থ্রি: সামার ভ্যাকেশন ছবিতে। হলিউডের এই অ্যানিমেশন ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজ করেছেন ওয়াহিদ। ছবির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সনি পিকচার্স ইমেজ ওয়ার্কসে অ্যাসোসিয়েট প্রডাকশন ম্যানেজার হিসেবে এ ছবিতে কাজ করেছেন। হোটেল ট্রানসেলভেনিয়া থ্রি: সামার ভ্যাকেশন মুক্তি উপলক্ষে এই ছবিতে ওয়াহিদ নিজের কাজের অভিজ্ঞতা প্রথম আলোকে লিখে জানালেন।

গেন্ডি টারটাকোভস্কির সঙ্গে এক সিনেমায় কাজ করব—এই কথা শুনেই আমি এক পায়ে রাজি! নব্বইয়ের দশকে যাঁরা বড় হয়েছেন, তাঁরা চেনেন এই ভদ্রলোককে তাঁর কাজের মাধ্যমে। সৃষ্টি করেছেন ‘ডেক্সটার্স ল্যাবরেটরি’ বা ‘সামুরাই জ্যাক’-এর মতো অমর কিছু কার্টুন। কাজ করেছেন ‘পাওয়ার পাফ গার্লস’, স্টার ওয়ার্স-এর ‘ক্লোন ওয়ার্স’সহ আরও অনেক কার্টুনে। তাঁরই নির্দেশনায় সনি পিকচার্স ইমেজওয়ার্কসে কাজ শুরু হবে হোটেল ট্র্যানসেলভেনিয়া থ্রির। চাকরি পাওয়ার পর জানলাম, আমি অ্যাসোসিয়েট প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেব ম্যাটপেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট ও লাইটিং ডিপার্টমেন্টের একটি অংশের।

অ্যানিমেশন ফিল্মে ম্যাটপেইন্টিং কাজটা বেশ মজার। সাধারণত পূর্ণিমা, সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়, বিশাল পাহাড় বা অসীম আকাশ—এ রকম চমৎকার সব দৃশ্য আঁকা হয় ম্যাটপেইন্টিংয়ে। এই বিভাগে কাজ করার সুবাদে আমি প্রথম কাজ করি কোনো সিনেমার প্রথম ও শেষ দৃশ্যে। ১২ জন আর্টিস্ট (শিল্পী) এবং ১ জন সুপারভাইজারকে নিয়ে গড়া এই দল কাজ করে চলচ্চিত্রের প্রায় ৫৬ ভাগে! যেখানেই দেখবেন আকাশ, সেখানেই জানবেন ম্যাটপেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট কাজ করেছে। ম্যাটপেইন্টিং বিভাগের পাশাপাশি কাজ শুরু করি লাইটিং ডিপার্টমেন্টের একাংশের সঙ্গে। ১৮ জন আর্টিস্ট, ১ জন সুপারভাইজারসহ এই টিম কাজ করে প্রায় ২০০ শটের ওপর। মূল সিনেমার যা প্রায় ১৬ ভাগ। এ রকম ৫টি লাইটিং টিম মিলে শেষ হয় পুরো সিনেমার কাজ। অ্যানিমেশনে লাইটিং টিম ভিএফএক্সের (ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস) তুলনায় একটু ভিন্নভাবে কাজ করে। অ্যানিমেশনে লাইটারকে নিজেই কম্পোজিটিং করতে হয়। ভিএফএক্সে সাধারণত যা করে আলাদা একটি বিভাগ। সুতরাং অ্যানিমেশনের লাইটিংয়ে (আলোকসজ্জায়) যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের জানতে হয় দুইটি সফটওয়্যার। আমরা ব্যবহার করি লাইটিংয়ের জন্য ‘মায়া’ এবং কম্পোজিটিংয়ের জন্য ‘নিউক’। আর এই ৩২ জনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বর্তায় আমার ওপর, যা আমি পালন করি সনির নিজস্ব কিছু প্রোপ্রাইটোরি সফটওয়্যারের সাহায্যে।
হোটেল ট্র্যানসেলভেনিয়া থ্রি ছবির পরিচালক গেন্ডি টারটাকোভস্কির সঙ্গে বাংলাদেশের ওয়াহিদ ইবনে রেজা
হোটেল ট্র্যানসেলভেনিয়া থ্রি ছবির পরিচালক গেন্ডি টারটাকোভস্কির সঙ্গে বাংলাদেশের ওয়াহিদ ইবনে রেজা
সনিতে প্রথম প্রজেক্ট হিসেবে হোটেল ট্র্যানসেলভেনিয়া থ্রিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল এককথায় অসাধারণ। এই প্রথম সিনেমার চরিত্রগুলো হোটেলের গন্ডি ছেড়ে বের হয়ে যায় এক প্রমোদতরীতে। বিশাল এই জাহাজ একেক বন্দরে থামে আর সৃষ্টি হয় মজার সব ঘটনার। প্রতিটা জগতের চেহারাও হয় একদম ভিন্ন। দর্শক হিসেবে তাই সিনেমাটি দেখার মজাই বেড়ে যায় অনেক। অনেক শক্তিশালী টিম ছিল আমাদের। একেকজনের ঝুলিতে ছিল ১০-১৫ বছরের অভিজ্ঞতা। তাই কাজের গতি ছিল একদম মসৃণ ও ঝঞ্ঝাটমুক্ত। আমাদের প্রডিউসারের ছিল এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার প্রায় ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা। একদিন প্রডিউসার ভদ্রমহিলা পড়লেন বিপদে। রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ি এসে ধাক্কা দিল তাঁকে। পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলেন। দিতে হলো ১৭টি সেলাই। এই অবস্থায়ও তিনি আমাদের সঙ্গে গুগল চ্যাটে কথা বলে গেলেন এবং আমাদের প্রায় হতভম্ব করে দিয়ে পরের দিনই হাজির হলেন অফিসে। এরপর আমার যদি কোনো দিন শরীর খারাপ বা অন্য কোনো কারণে অফিস যেতে ইচ্ছা না হতো, আমি নিজেকে প্রশ্ন করতাম, ‘আচ্ছা আমাকে কি গাড়ি ধাক্কা দিয়েছে? না!’ তখন নিজেকেই নিজে বলতাম, ‘তাহলে তো অফিস যেতে কোনো অজুহাত থাকা উচিত নয়।’

আমার এই প্রডিউসারই একদিন করে ফেললেন একটা ভয়ংকর কাজ। সরাসরি পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাকে স্বয়ং ছবির পরিচালক গেন্ডি টারটাকোভস্কির সঙ্গে! আসলে হয়েছে কী, আমাদের সবাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি, কেন এই ছবিতে আমরা কাজ করতে এসেছি। আমি অবলীলায় বলি, ‘গেন্ডির সঙ্গে কাজ করার জন্য।’ কথাটি তাঁর মনে ছিল। পরে একদিন পরিচালকের রিভিউ শেষে হুট করে গেন্ডিকে বললেন তিনি, ‘এই যে ইনি হচ্ছেন ওয়াহিদ, আমাদের এই ছবিতে জয়েন করেছেন শুধু তোমার জন্য!’ ডিরেক্টর চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘তা–ই নাকি?’ আমার তো গলা শুকিয়ে ততক্ষণে কাঠ। কোনোমতে বললাম, ‘আমি বাংলাদেশের ছেলে, আপনার বানানো কার্টুন দেখে আমার শৈশব, কৈশোর কাটে। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, ছেলেবেলার সেই দিনগুলোকে আনন্দে ভরিয়ে তোলার জন্য।’ ভদ্রলোক খুব অবাক হলেন। উপহার হিসেবে পাঠালেন অটোগ্রাফসহ সিনেমার পোস্টার! হাসতে হাসতে ঠাট্টা করলেন, অনেকটা আমাদের উন্মাদের আহসান হাবিব ভাইয়ের মতো! বললেন, ‘আশা করি আমার সঙ্গে কাজ করে তুমি হতাশ হওনি!’ এরপর আরেক দিন অনেকক্ষণ কথা হলো তাঁর সঙ্গে। বললাম, ‘আমার স্বপ্ন হচ্ছে গল্প বলার। হয়তো কোনো দিন বিশ্বের মঞ্চে নিজের গল্প বলার সুযোগ পাব।’ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন আমার কথা। বললেন যে লেগে থাকতে হবে, একের পর এক আইডিয়া এক্সিকিউট করে ফেলতে হবে। এর মধ্যে একটা যদি লেগে যায়, ব্যাস! বললাম, লেগে থাকব কাছিমের মতো কামড়ে। বজ্রপাতেও ছাড়ব না! হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, ‘ভালো, এই তো চাই!’

কিছু তথ্য অজানা
 পুরো সিনেমাটি শেষ করতে ওয়াহিদদের সময় লেগেছে দেড় বছরের মতো।
 ছবিতে কাজ করেছেন চার শরও বেশি আর্টিস্ট।
 এবারের সিনেমায় দুটি নতুন চরিত্র আছে। ভ্যান হেলসিং ও এরিকা হেলসিং। এই দুজনকে নিয়ে ওয়াহিদ ইবনে রেজাদের দল খুবই রোমাঞ্চিত ছিল।
 হোটেল ট্র্যানসেলভেনিয়া থ্রি-তে এবার পানির নিচের অদ্ভুত জগৎ অ্যাটলান্টিসকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখা যাবে।
 এ ছবির পরিচালক গেন্ডি টারটাকোভস্কি ‘ডেক্সটার্স ল্যাবরেটরি’ ও ‘সামুরাই জ্যাক’-এর মতো জনপ্রিয় কার্টুনের নির্মাতা।

সর্বশেষ খবর

রুপালি সৈকত এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by