logo

বুধবার, ১১ নভেম্বর ২০১৫ . ২৭ কার্তিক ১৪২২ . ২৮ মহররম ১৪৩৭

ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি
১১ নভেম্বর, ২০১৫

কিশোরগঞ্জ : করিমগঞ্জের জঙ্গলবাড়িতে ঈশা খাঁর জীর্ণ বাড়ি -আজকের পত্রিকা

সিম্মী আহাম্মেদ, কিশোরগঞ্জ
অদম্য মনোবল, সাহস ও দেশপ্রেমকে পুঁজি করে তারা লড়েছিলেন দুর্জেয় মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। ১৫৭৬ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন আফগান সুলতান দাউদ খান কররানী পরাস্ত হলেও তারা ১৬১২ সাল পর্যন্ত বাংলার স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্য অনবরত সংগ্রাম করেছেন। তাদের কর্তৃত্বে ছিল বাংলা। পশ্চিমে ইছামতি নদী, দক্ষিণে গঙ্গা (পদ্মা) নদী, পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্য এবং উত্তরে বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ সিলেটের বানিয়াচং পর্যন্ত সুবিস্তৃত ভাটি বাংলায় মোগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা ছিলেন একাট্টা। মোগল ঐতিহাসিক আবুল ফজল এবং মির্জা নাথান তাদেরকে ‘দাওয়াজদাহ বুমি’ অর্থাৎ ‘বার ভূঁইয়া’ নামে অভিহিত করেছেন। ভাটি বাংলার সেই বার ভূঁইয়াগণের অগ্রণী ঈশা খাঁ ছিলেন অবিভক্ত ময়মনসিংহ জেলা, ঢাকা ও কুমিল্লা জেলার অধিকাংশ অঞ্চল, নোয়াখালী, ফরিদপুর, পাবনা ও রংপুর জেলার কিয়দংশ এবং সিলেট জেলার পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে গঠিত এক বিশাল রাজ্যের স্বাধীন অধিপতি। আবুল ফজল ঈশা খাঁকে বলেছেন ‘মর্জুবানে ভাটি’ অর্থাৎ ভাটির রাজা।

ভাটির রাজা ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী ছিল জঙ্গলবাড়ি। কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার কাদিরজঙ্গল ইউনিয়নে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত জঙ্গলবাড়ি বর্তমানে ঈশা খাঁ দুর্গ নামে পরিচিত। ভাটির রাজা ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী জঙ্গলবাড়ির ঐতিহ্য সংরক্ষণে সম্প্রতি প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে এটিকে পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ইতোমধ্যে ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত জঙ্গলবাড়ি মসজিদটি প্রতœতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

জনশ্রুতি রয়েছে, বাংলার বার ভূঁইয়াদের অবিসংবাদিত নেতা ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল  সোনারগাঁয়ের নিকটবর্তী খিজিরপুর এলাকায়। মোগল সুবেদার মানসিংহের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে খিজিরপুর থেকে তিনি ব্রহ্মপুত্র ও শঙ্খ নদীর তীরবর্তী এগারসিন্দুরে আশ্রয় নেন। সেখানেও তার পরাজয় ঘটলে ঈশা খাঁ লক্ষণ সিং হাজরা নামে এক কোচ রাজার রাজধানী জঙ্গলবাড়ি আক্রমণ করে তা দখল করে নেন এবং সেখানেই তিনি তার রাজধানী স্থানান্তরিত করেন।

অনেকেই মনে করেন, লক্ষণ সিং হাজরা ও ঈশা খাঁ দু’জনের কেউই জঙ্গলবাড়ি দুর্গটির মূল নির্মাতা নন। দুর্গ এলাকার বাইরে বিশেষ করে দুর্গের দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম অংশে অসংখ্য ইটের টুকরা ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ রয়েছে। প্রাপ্ত নিদর্শনাবলি সম্ভবত প্রাক-মুসলিম আমলের এবং এটি ছিল একটি সমৃদ্ধশালী জনবসতির কেন্দ্র। তবে দুর্গের ভেতরে বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে ঈশা খাঁর। আছে তার বাসভবনের ধ্বংসাবশেষ। মূল ভবনটির ছাদ ধসে গেলেও দরবার কক্ষের অনেকটাই টিকে আছে। দরবার সংলগ্ন পান্থশালায় এখনও ১০-১২টি কক্ষের অস্তিত্ব দেখা যায়। পান্থশালার ধার ঘেঁষে চলে গেছে প্রাচীর। প্রাচীরের মাঝে মাঝে ফটক। ফটক ধরে ভেতরে গেলেই চোখে পড়ে বিধ্বস্ত অন্দরমহল। দেয়ালে ফুল ও লতাপাতার আল্পনা। কয়েকটি থামও অক্ষত আছে। থামের গায়ে আছে লতাপাতার নকশা। দুর্গের চারদিকে প্রমাণ করে, এটি ছিল বৃত্তাকার আকৃতির। দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর দিকে গভীর পরিখা খনন করা এবং পূর্বদিকে নরসুন্দা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়। বাড়ির সামনে রয়েছে তখনকার আমলের খনন করা একটি দীঘি। পাশেই রয়েছে মসজিদ। ধারণা করা হয়, ঈশা খাঁর হাতেই হয়তো মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। মসজিদের কাছে ঈশা খাঁর বংশধরদের বাঁধানো কবর রয়েছে। ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি দুর্গের একটি দরবার হল সংস্কার করে স্থানীয় প্রশাসন স্থাপন করেছে ‘ঈশা খাঁ স্মৃতি জাদুঘর।’ সেখানে রয়েছে ঈশা খাঁর বিভিন্ন ছবি, তার বংশধরদের তালিকা এবং বিভিন্ন নিদর্শন।

ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ি থেকে শাসন করতেন তার ২২টি পরগনা। এখানে থেকেই তিনি সোনারগাঁ দখল করে সেখানে স্থাপন করেন নতুন রাজধানী। আর তখন থেকেই জৌলুস হারাতে থাকে জঙ্গলবাড়ি। ষোড়শ শতকে বীর ঈশা খাঁ প্রতিষ্ঠিত ৪০ একর আয়তনের জঙ্গলবাড়ি দুর্গ আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। ঈশা খাঁর ১৪তম বংশধর দাবিদার প্রয়াত দেওয়ান আমিন দাদ খানের পরিবার ধ্বংসপ্রাপ্ত অন্দরমহলের কিছু অংশ সংস্কার করে এখানে বসবাস করছেন। এ অবস্থায় বীর ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত জঙ্গলবাড়ি দুর্র্গ, পরিখা ও স্থাপনাসমূহ সংরক্ষণ করে এটিকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর। এটিকে পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তোলার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত জঙ্গলবাড়ি মসজিদটি প্রতœতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। জঙ্গলবাড়ির সাড়ে ৪০০ বছরের স্মৃতি আজো বাঙালির অতীত শৌর্য-বীর্যের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে।

সর্বশেষ খবর

সারাবাংলা এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by