logo

শনিবার, ৯ জানুয়ারি ২০১৬ . ২৬ পৌষ ১৪২২ . ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৭

জেলেপল্লীর শিশুরা মাছ ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে!
০৯ জানুয়ারি, ২০১৬

পিরোজপুর : কাউখালীর উত্তাল সন্ধ্যা নদীতে প্রতিকূল আবহাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা চালাচ্ছে এক শিশু মৎস্যজীবী -আজকের পত্রিকা

পিরোজপুর প্রতিনিধি
পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার জেলে পল্লীর বেশির ভাগ শিশু উত্তাল সন্ধ্যা ও কচা নদীতে জীবন বাজি রেখে বড়দের সঙ্গে নৌকায় কাজ করছে। পরিবারিক দারিদ্রতা, অসচ্ছলতা, অসচেতনতার কারণে এমনটি করছে তারা। যে বয়সে জেলে পলীর শিশুদের শিক্ষা গ্রহনের কথা ঐ বয়সে তারা জীবন -জীবিকার কঠিন সংগ্রামে অত্যন্ত ঝুঁকি পূর্ন কাজে আত্ম নিয়োগ করছে।

কাউখালী উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে চিরাপাড়া ইউনিয়নের সন্ধ্যা নদী তীরবর্তী সুবিদপুর, জিবগা-সাতুরিয়া ও বেকুটিয়া গ্রাম। এখানকার অধিকাংশ লোকই নদীতে মাছ ধরা পেশার সাথে জড়িত। এদের স্বল্প আয়ের যোগান হয় না। পরিবারের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে জেলে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ন কাজে নিয়োগ করছে। স্বাভাবিক ভাবে একটি শিশু বেঁচে থাকা, বিকাশ এবং সুরক্ষার জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন এসব জেলে শিশুরা সে সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ এলাকার  ছেলে-মেয়েদের খুব একটা পড়াশোনার সুযোগ মেলে না। এদের কেউ কেউ প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়তেই বিভিন্ন কাজে জুড়ে দেওয়া হয়। তবে এসব শিশুদের প্রায় অধিকাংশই নিয়োজিত হয় মাছ শিকারে। এর বাইরে কিছু শিশু বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, হোটেল-রেস্টুরেন্টেও কাজ করে। অনেকে রিকশা চালায় বা দিনমজুর হিসেবে কাজ করে।

এদিকে, কম বয়সে এসব শিশুরা অন্যদের মতো পরিশ্রম করলেও তাদের মজুরি দেওয়া হয় কম। কোনোমতে দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থার বাইরে দৈনিক ৮০ থেকে ১০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয় শিশু  জেলেদের। একাধিক শিশু জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীতে মাছ ধরার  গোনে (সিজনে)  রাত  ৩টা থেকে ৪টার মধ্যেই তাদের নেমে পড়তে হয় মাছ ধরার কাজে ।

এলাকার ৮ বছরের শিশু রাজু জানায়, অভাবের কারনে সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে নদীতে মাছ ধরে। মাঝে মাধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তার দেখাতে পারেনা টাকার অভাবে। সে আরো জানায় স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেনী পর্যন্ত পড়েছে কিন্তু পরবর্তীতে সংসারের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে কাজে নেমে পড়ে। এরকম রাজুর  মতো সুবিদপুর গ্রামের শতাধিক শিশু মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। এলাকার অধিকাংশ লোক জেলে হওয়ার কারনে দারিদ্রতা তাদের নিত্য সঙ্গী, তাদের শিশুদের কোন আকাক্সক্ষাই পূরণ করতে পারছেনা।

১৩ বছরের শিশু সোহেল গত ৪ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরে। ইতোমধ্যেই তার নদীতে মাছ ধরা সকল কৌশল ও ঝড় বৃষ্টির সময় উত্তাল নদীতে বিপদে পড়ে ভয় পাওয়া অভিজ্ঞতা রয়েছে। জেলে পলীর শহীদ (১২) সারাদিন নৌকায় কাজ করে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আয় করে, ৩ বোন ১ ভাই সহ পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭ জন। শহীদ বলে, অন্যের নৌকায় কাজ করি, অনেক সময় বড়রা বেশি টাকা নেয়। ছোটদের অনেক কম টাকা দেয়। সে একদিন বড় হয়ে বেশি আয়ের স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে একদিন তার জাল, নৌকা হবে। তা দিয়ে ভাল সংসার চালানোর মত আয় করা যাবে। সুবিদপুর গ্রামের জিয়া (১৩) জেলে শিশু ৫ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরে। প্রতিদিন গড়ে ৮০ টাকা আয় করে। তার বাবা হানিফ ও একই নৌকায় মাছ ধরে। সে কখনই স্কুলে যায়নি। জেলে শিশুদের অধিকাংশরা ছোট নৌকায় জাটকা ইলিশ ধরে। জাটকা নিধনের সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযানের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেন অনেক শিশু।

এক শিশু জেলের বাবা তোফাজ্জেল হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ‘আমাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ইচ্ছে করে। নদীতে মাছ নেই, সারাদিন জাল বেয়ে ২শ টাকাও ভাগে পড়ে না। তার উপরে রয়েছে সপ্তাহে ৩টি কিস্তি ১২শ থেকে ১৩শ টাকা। তাই  নৌকায় ভাগী না নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে আসি। অন্তত সারাদিন জাল  ফেলে যা মাছ পাই তাতে ভাগীদের ভাগ দিতে হয় না।’

সরকার ঘোষিত মাছ ধরা নিষিদ্ধের সময় জেলেদের ৩০  কেজি করে চাল দিচ্ছে সরকার, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এ কারণে তারা জীবন বাঁচানোর জন্য সন্তানদের নিয়ে নদীতে মাছ ধরছে। এভাবেই দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ শিক্ষার আলো থেকে দূরে  থেকে যাচ্ছে।

চিড়াপাড়া-পারসাতুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান  নজরুল ইসলাম বাদশা বলেন ,সুবিদপুর গ্রামের জেলে পলীর প্রায় সব শিশুরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নদীতে মাছ ধরার কাজে কাজ করছে। অনেকে স্কুলে ভর্তি হয় উপবৃত্তির টাকার জন্য। তারা মাঝে মধ্যে স্কুলে আসে  আর  বাকি সময়ে ছোট বড় নৌকায় মাছ ধরার কাজ করছে ।

সর্বশেষ খবর

সারাবাংলা এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by