logo

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারি ২০১৬ . ২৯ পৌষ ১৪২২ . ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৭

এ এক রাজাহীন ভগ্ন রাজ্য
১২ জানুয়ারি, ২০১৬

পিরোজপুর : রায়েরকাঠি রাজবাড়ির ৩৫৭ বছরের পুরানো মঠগুলো এখনও কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে - আজকের পত্রিকা

মশিউর রহমান রাহাত, পিরোজপুর
কালের স্বাক্ষী বহন করে দাঁড়িয়ে আছে পিরোজপুরের রায়েরকাঠির রাজবাড়ি। সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো এই রাজবাড়িটি জড়াজীর্ণ, ভগ্ন, রুগ্ন হয়ে এই শতাব্দীতেও দাঁড়িয়ে আছে। নেই শুধু রাজা, পাইক-পেয়াদা আর জমিদারি শাসন। প্রাচীন মঠ আর নানা করুকার্য খচিত রাজবাড়িতে রয়েছে মোগল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে নির্মিত সাড়ে তিনশ বছরের পুরানো কালী ও শিব মন্দির। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রাজা রুদ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী রাজবাড়িটি ও এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। জানা গেছে এশিয়া মহাদেশের সর্ব বৃহৎ ও দামি শিব মন্দিরটি রয়েছে এখানে। রাজবাড়ির উত্তরাধিকাররা দাবি করেন, কষ্টিপাথর দিয়ে নির্মিত প্রায় ৪০ মণ ওজনের এ শিব লিঙ্গের মূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

রক্ষাবেক্ষণের অভাবে মূল রাজবাড়িটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও প্রাচীন ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৩৫৭ বছরের প্রাচীন কালী মন্দির, শিব মন্দিরসহ ৭৫ ফুট উচ্চতার ১১টি মঠ। ইট-সুরকি দিয়ে নিখুঁত গাঁথা মঠগুলোর নির্মাণশৈলী মোগল স্থাপত্যকলার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মনোমুগ্ধকর এ শৈল্পিক স্থাপনাগুলোর গায়ে এখন শুধুই অযত্ন-অবহেলার ছাপ।

পিরোজপুর শহর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে রায়েরকাঠি গ্রামে অবস্থিত রাজবাড়ি। দুইশ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাজবাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রয়েছে কালী ও শিব মন্দির। সংস্কারের অভাবে সুউচ্চ মঠগুলো ভেঙে যাচ্ছে। রাজ প্রথা বিলুপ্তির পরে চালু হয় জমিদারি প্রথা। আর রুদ্র নারায়ণ রায়ের উত্তরসূরিরা রাজা থেকে পরিণত হন জমিদারে। একসময়ে রাজবাড়িতে মহিষ বলি দিয়ে ঘটা করে কালী পূজা অনুষ্ঠিত হত। বাংলা ১২শ ৭৫ সালের দিকে প্রচলিত ছিলো স্বতীদাহ প্রথাও। তবে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর রাজ বাড়ি জৌলুস হারায়। এখন প্রতি বছর পাঠা বলি দিয়ে কালী পূজা উদ্যাপিত হয়।

পিরোজপুরের ইতিহাস গবেষক গোলাম মোস্তফা তার ‘সংগ্রামী পিরোজপুর’ বইয়ে লিখেছেন, সম্রাট আকবরের সময় যুবরাজ সেলিম (সম্রাট জাহাঙ্গীর) বিদ্রোহ করে বাংলা মুল্লুকে আসেন। এরপর তিনি ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলার কিছু অংশ নিয়ে একটি পরগনার সৃষ্টি করেন। নিজের নামে পরগনার নাম রাখেন সেলিমাবাদ। ১৬১৮ সালে সেলিমাবাদ পরগণার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পান মদন মোহন। ১৬২৮ সালে মদন মোহন তার ছেলে শ্রীনাথের নামে সেলিমাবাদ পরগনার পাট্টা নেন। শ্রীনাথ ঝালকাঠির লুৎফাবাদ গ্রামে কাচারি স্থাপন করে সেখানে বসবাস করতেন। এরপর মোগল সম্রাট শ্রীনাথকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৬৫৮ সালের শ্রীনাথ রায়ের ছেলে রুদ্র নারায়ন রায় চৌধুরী পিরোজপুরের অদূরে বসবাস শুরু করেন। সেখানে জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে রাজবাড়ি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে রাজ্য স্থাপন করেন বলেই সেখানের নামকরণ করা হয়েছে রায়েরকাঠি। রাজা রুদ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় পাঁচ জন চণ্ডালের (নিম্নবর্ণের হিন্দু) মুন্ড কেটে তার ওপর মূর্তি স্থাপন করেন। রুদ্র নারায়ণ ওই পাঁচ চণ্ডালকে অর্থ লোভে বশীভূত করে মুণ্ড দিতে বাধ্য করেন। রাজার এ নিষ্ঠুর ঘটনাটি ঢাকার প্রদেশিক সুবেদার শাহবাজ খানের কাছে নালিশ যায়। সুবেদার এ ঘটনার বিচার করে রুদ্র নারায়ণকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য রুদ্র নারায়ণকে হাজার হাজার মানুষের সামনে বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়ে বাঘ দিয়ে হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়। তবে খাঁচার মধ্যে রুদ্র নারায়ণ লড়াই করে বাঘকে মেরে ফেলেন। এ খবর সুবেদারের কাছে গেলে তিনি রুদ্র নারায়ণের দণ্ড মওকুফ করে দেন। রুদ্র নারায়ণ তাঁর কৃত কর্মে লজ্জিত হয়ে রাজ বাড়িতে ফিরে না গিয়ে ছেলে নরোত্তম নারায়ণ রায়কে রাজত্ব দিয়ে কাশি চলে যান। সেখানে তিনি আমৃত্যু সন্ন্যাস জীবন অতিবাহিত করেন।

তবে রাজপরিবারের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগের পাশাপাশি জনহিতকর কাজের সুনামও রয়েছে। প্রজাদের পানিও জলের সুবিধার জন্য তারা রাজ্যে অনেক দিঘি খনন করেন। এর মধ্যে জেলার নাজিরপুর উপজেলার কালীবাড়ির কালির পুকুর এখনো হাজার হাজার মানুষের পানিয় জলের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সড়ক ও কাঠের সেতু নির্মাণ করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজবাড়ির প্রধান ফটক, রাজাদের বসবাসের বহুতল ভবনগুলো, বিচারালয়, কাচারিঘর, জলসাঘর, অন্ধকূপ ভেঙে গেছে। মোগলদের মন্দিরের নকশায় নির্মিত মঠগুলো ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেছে। মঠগুলোর দেয়ালে মাটির অলংকরণ ক্ষয়ে গেছে। মঠের গায়ে শেওলা ও লতাপাতা জন্মেছে। নবরত্ন মঠসহ তিনটি মঠের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। একটি মঠে (মন্দির) সংরক্ষিত আছে কষ্টিপাথরের মহামূল্যবান শিব মূর্তি। জনশ্রুতি রয়েছে সাড়ে পাঁচ ফুট দৈর্ঘের শিবলিঙ্গটি এশিয়া মহাদেশের সর্ব বৃহৎ শিবমূর্তি। মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা জানান, এক সময়ে প্রতিটি মঠে একসময় শিবমূর্তি সংরক্ষিত ছিল। পরে তা চুরি হয়ে গেছে। 

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই অনেকেই আসছেন পিরোজপুরের রায়েরকাঠীর  ঐতিহাসিক  এ রাজবাড়ি দেখতে। রায়েরকাঠী শিব ও কালীমন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক, রাজ বংশের ২৯ তম পুরুষ গৌতম নারায়ণ রায় চৌধুরী বলেন, ‘রাজবাড়ি ও মঠগুলো সংরক্ষণ করা খুবই ব্যয়বহুল। আর এই খরচ বহন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা বেশ কয়েকবার প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের কাছে এগুলো সংরক্ষণের জন্য আবেদন করেও কোনো সাড়া পাইনি।’

প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক (খুলনা অঞ্চল) মো. আমিরুজ্জামান জানান, ‘পিরোজপুর জেলায় আমাদের কোন জরিপ হয়নি। এ কারণে রাজবাড়িটি সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। তবে এ ব্যাপারে লিখিত আবেদন পেলে আমরা সরেজমিনে দেখে রাজবাড়ি ও মন্দির সংরক্ষণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠাতে পারি। পুরার্কীতির ব্যাপারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে।’

পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক এ কে এম শামিমুল হক সিদ্দিকী  বলেন, রাজবাড়ি ও মঠগুলো সংরক্ষণ এবং সংস্কারের জন্য মন্দির কমিটিকে আবেদন করতে হবে। তারা আবেদন করলে আমরা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেব।

 

সর্বশেষ খবর

সারাবাংলা এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by