logo

রোববার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ . ১১ মাঘ ১৪২২ . ১৩ রবিউস সানি ১৪৩৭

পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে ৯০ ভাগ মানুষ কৃষিজমি অধিগ্রহণের টাকা পায়নি
২৪ জানুয়ারি, ২০১৬

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) : পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণ করা মানুষগুলো বেড়িবাঁধের স্লোপে আশ্রয় নিয়েছে। ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অধিগ্রহণ করা জমিতে চলছে উন্নয়নমূলক কাজ - আজকের পত্রিকা

খালিদ মিল্কি, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা
কলাপাড়ার নিশানবাড়িয়া ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প এরিয়ায় অধিগ্রহণকৃত মধুপাড়া এলাকায় ১৪ বিঘা জমি নিয়ে বাড়িঘর ছিল। ছিল দুইটি পুকুর। পুকুরে ছিল মাছে পরিপূর্ণ। বাড়িঘর, পুকুরের মাছ, গাছপালা বাবদ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেয়ে বাড়িঘর ছেড়ে এখন এ মানুষটি বেড়িবাঁধের সেøাপে অস্থায়ী ঝুপড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তার নাম মাস্টার আবুল কালাম আযাদ। বয়স ৬০ এর কোঠায়। কিন্তু ১৬ বিঘা কৃষিজমি বাবদ একটি টাকাও এখন পর্যন্ত তুলতে পারেননি। বাড়িঘর গাছপালার ক্ষতিপূরণের চেক গ্রহণের দিন (১৩ জুন) জেলা প্রশাসক ও পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির আশ্বাসে এ জমিতে চাষাবাদ করেছিলেন। কিন্তু ধানের শীষ বের হওয়ার প্রাক্কালে ওই ধান উপড়ে ফেলেছে ডিজেল প্লান্ট লিমিটেড প্রকল্পের বালু ভরাটের কাজে নিয়োজিত এনডিএ প্রতিষ্ঠানের লোকজন। এনিয়ে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের কাছে শত শত কৃষক ধরনা দিয়েছিলেন। মাত্র একটি মাস সময় দিলে এ বছরের আমন ফলন ঘরে তুলতে পারতেন। এ মানুষটির প্রশ্ন যদি ধান চাষের অনুমতি না দিত তাহলে তাদের চাষাবাদ বাবদ লাখ লাখ টাকার ক্ষতির কবলে পড়তে হতো না। মাস্টার আবুল কালাম জানান, এক কড়া (তিন শতক) জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ কলাপাড়ার কোথাও, এমনকি বেড়িবাঁধের বাইরের আবাদ অযোগ্য এক কড়া জমি কিনতেও কমপক্ষে দরকার ৫০ হাজার টাকা। এতবড় ক্ষতির পরও এ মানুষটি আজ পর্যন্ত জমির ক্ষতিপূরণের একটি টাকা তুলতে পারেননি। স্থানীয় একটি মধ্যস্বত্তভোগী  জমির মালিকানায় জটিলতা সৃষ্টি করায় তারা এ টাকা তুলতে পারছেন না। এ সব কৃষকের কাছে সর্বশেষ জরিপের (বিএস) কাগজপত্র রয়েছে। এসব কাগজপত্র ও পর্চাও ভূমি প্রশাসনের লোকজন দিয়েছে। ওই পর্চা অনুসারে ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করলে এ পরিবারটি অন্য কোথাও গিয়ে বাড়িঘর কিংবা বসতি করতে পারত। ক্ষতিপূরণের টাকা এতটা অবাস্তবসম্মত নির্ধারণ করা হয়েছে যে কেউ অন্যত্র গিয়ে পুনর্বাসনের সুযোগ নেই। আবুল কালাম আযাদের দাবি শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ কৃষি জমির ক্ষতিপূরণের টাকা আজ পর্যন্ত পায়নি। ফলে অধিগ্রহণকৃত এলাকায় বসবাস করা পরিবারগুলো লোন্দা খেয়াঘাটের দক্ষিণ দিকে মাছুয়াখালী থেকে শুরু করে চরনিশানবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কি.মি. এলাকায় বেড়িবাঁধের বাইরে অস্থায়ী ঝুপড়িঘর তুলে আশ্রয় নিয়েছে। একশ’ থেকে দেড়শ’ বছরের পুরনো এ পরিবারগুলোর দাবি তাদের দাদার বাবা (তালইয়ের) আমল থেকে বসবাস করছেন অথচ এখন জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে ক্ষতিপূরণের টাকা পাচ্ছেন না। মোহাম্মদ ইউসুফ মুন্সী জানালেন, বাবার কবরসহ ৬ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। একটি টাকাও পায়নি। মোজাম্মেল হোসেন জানান, দুই ভাইয়ের ১৮ কড়া জমির ক্ষতিপূরণের টাকার চিঠি পেয়েছেন বহু আগে। এলএও অফিস পটুয়াখালীতে সব কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। জমির কাগজপত্র ঠিক করতে ২৬ হাজার টাকা খরচ করেছেন। পটুয়াখালী যাওয়া-আসা বাবদ বহু টকা ব্যয় হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ধানখালীর তহসিলদারকে দশ হাজার টাকা দিয়েছেন। ইউসুফ জানান, তার দাদা গফুর আলী মৃধা চান্দু মগের (রাখাইন) কাছ থেকে এ জমি কিনে ভোগদখলে ছিলেন। তারপরও তার ওয়ারিশ দাবি করে স্থানীয় একটি চক্র ডিসপুট (আপত্তি) দেয়। তারপরও ১০-১৫ জনে মিলে তাদের প্রায় চার লাখ টাকা দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। আজ এরা সবাই নিঃস্ব। ডেইলি লেবারে পরিণত হয়েছেন। এভাবে অন্তত অর্ধশত পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল কেউ টাকা পায়নি। শুধু ইসমাইল তালুকদার ও হোসেন তালুকদার ছাড়া আর কেউ কৃষি জমির ক্ষতিপূরণ পায়নি বলে জানালেন ক্ষতিগ্রস্তরা। ফার্নিচারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাসান মোল্লা। স্ত্রী রুবিনা ও মেয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনামিকাকে নিয়ে তিনজনের সংসারে এখন চরম দুরবস্থা।  বাড়িঘর ছেড়ে বেড়িবাঁধের স্লোপে আশ্রয় নিয়েছেন। কৃষি জমির ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। এভাবে পারিবারিক ওয়ারিশ বিরোধ, স্থানীয় একটি মধ্যস্বত্বভোগীর হয়রানির কারণে। প্রায় তিনশ’ পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। আশ্রয় হারা হয়ে বাঁধের সেøাপে অবস্থান করছেন। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকার মানুষকে বাড়িঘরের, গাছপালার ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন করতেও লাখ প্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে স্থানীয় একটি দালালচক্র। যার মধ্যে আজাহার তালুকদার, শাহআলম হাওলাদার, ফুর্তি হাওলাদার, নান্টু খান, ফিরোজ তালুকদারের নাম উল্লেখ করেছেন। এদের সঙ্গে রয়েছে ধুলাসারের রিপন ভুইয়া নামের এক ব্যক্তি। যাদের সঙ্গে এলএও অফিসের প্রত্যক্ষ ভাগাভাগি রয়েছে। এভাবে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণাধীন এলাকার গরাৎ খা, দাশের হওলা, মরিচবুনিয়া, চরনিশানবাড়িয়া, মধুপাড়া ও নিশানবাড়িয়া গ্রামের তিন শতাধিক কৃষক পরিবার পড়েছে চরম দুরবস্থায়। এসব কৃষকের দাবি এক হাজার একর জমির মধ্য থেকে মাত্র ৩০ একর জমির টাকা হয়তো উত্তোলন করতে পেরেছে। ক্ষতিপূরণের টাকা না পাওয়া মানুষগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। শুধু ওই মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের প্রতিবন্ধকতার কারণে এর নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সরকারের অপরসব বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্প এলাকার মানুষের মধ্যে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ জানান, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় চরমভাবে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। যা কোনো মতেই বাস্তবসম্মত নয়। তারপরও একের পর এক ঝামেলা, মামলা, আপত্তি দিয়ে একটি চরম অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন এে ব্যাপারে স্থানীয় পাঁচ ব্যক্তিকে দায়ীর পাশাপাশি জেলা-উপজেলা প্রশাসনের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন। সমান দায়ী করেছেন এলএও অফিসকে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সরাসরি এ বিষয়টি নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। ইতিমধ্যে এ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কলাপাড়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা হয়েছে। অধিগ্রহণকৃত এলাকার বাসিন্দা লালুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন তালুকদার কয়েক প্রতারকের বিরুদ্ধে অতি সম্প্রতি একটি মামলা করেছেন। তিনি জানান, ভুয়া রাখাইন ওয়ারিশ দাবি করানোর মধ্য দিয়ে অধিগ্রহণ এলাকার কৃষকের নামে ৩২টি মামলা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে আসামিরা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই মামলা প্রত্যাহার করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের টাকা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি অন্তত এক কড়া (তিন শতক) জমি বাবদ কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হোক।

উল্লেখ্য, গত ২১ অক্টোবর একনেক বৈঠকে ১৩২০ মেগাওয়াট থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট শীর্ষক এ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। এজন্য মেট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৮২ কোটি ৬২ লাখ টাকা।  সর্বশেষ ৭ নভেম্বর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এমপি। পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ধানখালী ইউনিয়নের নিশানবাড়িয়া, মধুপাড়া ও চরনিশানবাড়িয়া এলাকায় ৯৯৯ দশমিক ৮১ একর জমির ওপর পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। বর্তমানে চলছে প্রকল্প এলাকায় বালু ভরাটের কাজ। ডিজেল প্লান্ট লিমিটেড নামের একটি সংস্থা এ কাজ করছে। এ বিষয়ে একাধিকবার উপজেলা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলা হয়েছে। তারা সুস্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি। তবে পটুয়াখালী এলএও অফিস সূত্রে জানা গেছে, কাগজপত্র সঠিক থাকলে তাদের দিক কোনো সমস্যা নেই। দালাল চক্রের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

 

সর্বশেষ খবর

সারাবাংলা এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by