logo

মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি ২০১৬ . ১৩ মাঘ ১৪২২ . ১৫ রবিউস সানি ১৪৩৭

আসল বিএনপির কর্ণধার দাবিদার
কে এই কামরুল হাসান নাসিম?
২৬ জানুয়ারি, ২০১৬
চৌগাছা (যশোর) সংবাদদাতা
সাম্প্রতিককালে ‘আসল বিএনপি’র কর্ণধার দাবিদার কামরুল হাসান নাসিম। কে এই নাসিম? প্রশ্ন এখন দেশের সর্বমহলে। ঢাকায় সাংবাদিকদের কাছে তিনি দাবি করেন যশোরের চৌগাছা উপজেলা কৃষক দলের সদস্য তিনি। আবার কখনও কখনও দাবি করেন ঢাকা মহানগর কৃষকদলের সদস্য বলে। তবে চৌগাছা উপজেলা কৃষকদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মিজানুর রহমান জানিয়েছেন এ নামে তার কমিটিতে কোন সদস্য কোন দিন ছিল না। প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি প্রভাষক আক্তারুজ্জামানেরও একই কথা।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন চৌগাছা উপজেলায় কৃষকদলের মাত্র দুটি কমিটি হয়েছে- একটি প্রতিষ্ঠাতা কমিটি। সেটির সভাপতি মিজানুর রহমান, সেক্রেটারি প্রভাষক আক্তারুজ্জামান। আর বর্তমান কমিটি গঠন হয় ২০১৩ সালে। এই কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফি আর সেক্রেটারি হলেন রহমান।

তাহলে তিনি দাবি করেন কিভাবে? এর জবাবে জহুরুল ইসলাম জানান, ২০০৩ সালে হঠাৎ করে কামরুল হাসান নাসিম নামের এক ব্যক্তি নিজেকে কৃষক দলের ঢাকা মহানগর কমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে চৌগাছার কিছু উঠতি যুবককে বশ করে একটি জনসভা করতে চায়। স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল, কৃষকদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের দৃঢ় অবস্থানের কারণে সে আর সভা সমাবেশ করতে পারেনি। পরে শুনেছি তার বাড়ি চৌগাছা উপজেলায়। তাকে কোন দিনে দেখেনওনি দাবি জহুরুল ইসলামের।

এসব কারণেই গত শনিবার খোঁজ নিতে যায় তার গ্রামের বাড়ি চৌগাছা উপজেলার মুক্তারপুর গ্রামে। এই গ্রামের মৃত বারিক মন্ডলের ৭ ছেলের মধ্যে মেজ ছেলে মৃত মুনছুর আলী এই কামরুল হাসান নাসিমের পিতা। মুনছুরের এক ভাই মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের নির্বাচিত নেতা। পারিবারিকভাবে তারা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও বড় কোন পদ-পদবীতে নেই। গ্রামে নাসিমের ৬ চাচার কয়েকজন এবং তাদের ছেলে-মেয়েরা বসবাস করেন। নাসিমের চাচা-চাচীরা জানান,  মুনছুর আলী বিয়ের আগে ধুলীয়ানী সম্মেলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। অল্প বেতনের চাকুরে বলে তার বিয়ে হচ্ছিল না। এরপর তিনি যশোর শহরের পালবাড়ী বিয়ে করে যশোর চলে যান। সেখানে তিনি ভেন্ডারের ব্যবসা শুরু করেন। এরপর সিভিল এভিয়েশনে চাকরি পান।

মুনছুর আলীর বাল্যবন্ধু উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি চৌগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিএম হাবিবুর রহমান জানান, মুনছুর আলী ভাগ্য বদলে অনেক কিছুই করেছে। বিয়ে করে যশোরে যাওয়ার পর ওর ভাগ্য বদল হয়।

কামরুল হাসান নাসিম ২ ভাই ১ বোনের মধে ২য়। কামরুল হাসান নাসিম ১৯৯২ সালে ঢাকার একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৯৪ সালে রাজশাহীর একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

নাসিমের চাচাতো ভাই চৌগাছা জেএমএসকে কলেজের প্রভাষক মনিরুজ্জামান বলেন, ২০০৩ সালে নাসিম আমার কাছ থেকে ১ লাখ, আমার বন্ধু নারায়ণপুর গ্রামের হাফিজ আল আসাদের ৫০ হাজার, কোটচাঁদপুরের আজিজের কাছ থেকে ১ লাখ, যশোরের পরিতোষের কাছ থেকে ১ লাখ, আলমের কাছ থেকে ৫০ হাজার ও মুকুটের কাছ থেকে ১ লাখ মোট ৬ জনের কাছ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা নেয় উত্তরা ব্যাংকে চাকরি দেবার নাম করে। আমাদের বলে সে উত্তরা ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আমাদের নিয়োগপত্রও দেন। পরে যোগদান করতে গিয়ে দেখি সব ভুয়া। এসময় নাসিম পালিয়ে যায়। আমরা সেই টাকা আজও ফেরত পাইনি।

তার ভাই আসল বিএনপির কর্ণধার দাবি করেছে বলতেই হাসিতে ফেটে পড়েন তিনি। বলেন নাসিম যে কি চিটার তা আমি সব থেকে ভাল করে জানি। আমার সামনে সে কখনও মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারবে না। ওর মুখে আবার জিয়াউর রহমানের আদর্শ! সামনে পেলে ওর দু’গালে দুটি জুতার বাড়ি দিয়ে বলতাম তুই এত আদর্শবান কোথা থেকে হলি?

মনিরের বন্ধু ও চৌগাছার এবিসিডি ডিগ্রি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রভাষক হাফিজ আল আসাদ বলেন, নাসিম তো একটা চিটার। ও আমাদের কাছে পরিচয় দেয় উত্তরা ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা বলে। আমরা সরল বুঝে ওর নিকট টাকা দেই। সে আমাদের নিয়োগপত্রও দেয়। যোগদান করতে গিয়ে দেখি সেটা নকল নিয়োগপত্র। তখন নাসিম পালিয়ে যায়। পরে শুনি সে নাকি উত্তরা ব্যাংকের মার্কেটিং সাইটের কর্মচারী ছিল। তবে আমাদের টাকা আজও ফেরত পাইনি। টিভিতে দেখলা সে-ই নাকি আসল বিএনপির কর্ণধর। হাসি পায় ওর মুখে যখন জিয়ার আদর্শের কথা শুনি।

জানা গেছে, চৌগাছায় গ্রামে এসে তখন সে প্রচার করত আমি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা। আগামী নির্বাচনে আমি বিএনপির মনোনয়ন পাব। সে সময় চৌগাছার মুক্তারপুর, নারায়নপুর, পাশাপোল ও জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে চার হাজার শাড়িও বিতরণ করেন বলে দাবি করলেন তার আরেক চাচাত ভাই।

 সে সময় চৌগাছা বিএনপির হাতে ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যান নাসিম। এরপর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর সদর আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচনও করেন এই কামরুল হাসান নাসিম। নির্বাচনে তিনি ৩ শত ৪৫ ভোট পেয়ে জামানত হারান।

এরপর মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসলে বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের স্ত্রী ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ওবায়েদের সাথে নিয়ে গড়েন ‘এসো গড়ি বাংলাদেশ, নামের একটি সংগঠন। তারপর সেখান থেকে এসে আসল বিএনপির কর্ণধার বলে দাবি করে একাধিকবার বিএনপির চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমানকে ব্যর্থ বলে দলের নেতৃত্ব তার কাছে ছেড়ে দেয়ার জন্য কয়েকবার আল্টিমেটাম দেন। এরপর চলতি মাসে দু’-দুবার বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস দখল নিতে যান তিনি। এর পরের কাহিনী তো সবারই জানা।

সর্বশেষ খবর

সারাবাংলা এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by