logo

শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ . ৮ ফাল্গুন ১৪২২ . ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৭

ভাষা সৈনিক আবুল হোসেনের পরিবারে বড়ই দুর্দিন
২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
পাবনা প্রতিনিধি
৬৪ বছর আগে এক বসন্ত দিনে যে দ্রোহ নিয়ে বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কারাবরণ করেছিলেন, সেই দ্রোহের উত্তাপে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিদারুণ আর্থিক অনটন আর দরিদ্রতার মাঝেও যিনি মাথা উঁচু করে বেঁচে ছিলেন তিনি হলেন পাবনার চাটমোহরের ভাষা  সৈনিক আবুল হোসেন।

প্রচ- আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন এই অভিমানী মানুষটি আজ আমাদের মধ্যে না থাকলেও আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল একটি অধ্যায়ে অনন্য এক অবদান রেখে গেছেন। সেই ভাষা সৈনিক আবুল হোসেনের সংসারে আজ বড়ই দুর্দিন। প্রতিবছরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আসলে তাদের স্মরণ করা ছাড়া তাদের খোঁজ নেয় না কেউ। প্রচ- আর্থিক অনটন আর দরিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত আট সদস্যের সংসারটিকে নিয়ে আবুল হোসেনের বিধবা স্ত্রী মোমেনা বেগম (৬০) দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

আবুল হোসেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একটি ভাঙ্গা সাইকেলে চড়ে গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মানুষের চিকিৎসা করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। এজন্য তিনি এলাকায় গ্রাম্য ডাক্তার হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। বায়ান্ন সালের উত্তাল দিন। তখন আবুল হোসেন দশম শ্রেণির ছাত্র। ২৪ ফেব্রুয়ারি চাটমোহর হাইস্কুলের কদমতলায় রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে ও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে মথুরাপুর গ্রামের বাড়ি থেকে ভাষা আন্দোলনের নেতা আবুল হোসেনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। পাবনা জেল হাজতে দেড় মাস এবং রাজশাহী কারাগারে ১৫ দিন আটক থাকার পর মুক্তি পেয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য গ্রাম্য ডাক্তারিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।

দীর্ঘ ৩৭ বছর তিনি গ্রাম্য ডাক্তারি করে নয় সদস্যের সংসার চালাতেন। ১৯৮৯ সালে প্যারালাইসিস আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হন আবুল হোসেন। তিনি অসুস্থ্য হবার পর তার বড় ছেলে আব্দুল আজিজ সংসারের হাল ধরেন। আজিজ তখন ৮ম শ্রেণির ছাত্র। সংসারের বোঝা মাথায় নেয়ার পর তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। কি করবেন ভেবে না পেয়ে আজিজ তার পিতার পেশা গ্রাম্য ডাক্তারিকেই আঁকড়ে ধরেন।

প্যারালাইসিসে পড়ে থাকা আবুল হোসেন ছেলে আজিজকে গ্রাম্য ডাক্তারির বিদ্যা ও কবিরাজি ঔষধ তৈরির পদ্ধতি হাতে কলমে শিখিয়ে দেন। প্যারালাইসিস থেকে সুস্থ হয়ে হাঁটাচলা করতে পারতেন। কিছুদিন সুস্থ থাকার পর আত্মঅভিমানী এই মানুষটি ৬৮ বছর বয়সে ২০০৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।

পিতার মৃত্যুর পর থেকে আব্দুল আজিজই সংসারের হাল ধরে কোনমতে চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন তাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়। আবুল হোসেনের বিধবা স্ত্রী মোমেনা খাতুন তার চার ছেলে, তিন নাতনীসহ ১১ সদস্যের সংসার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

প্রয়াত ভাষা সৈনিক ডাঃ আবুল হোসেনের মৃত্যুর পর সরকারী কিংবা বেসরকারীভাবে কেউ কোন খোঁজ-খবর নেয়নি। বর্তমানে আবুল হোসেনের ৪ ছেলের মধ্যে আব্দুল আজিজ (৩৭) মলম, গোলাপজল, মাজন, এসব তৈরি করে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করেন। আব্দুল আলিম (৩০) ঢাকায় এক কাপড়ের দোকানে কর্মচারী। আরিফ (২৬) একটি ডেকোরেটর দোকানের কর্মচারী।  ছোট ছেলে আজিম (১৯) পড়ালেখা করছে। তিন মেয়ের মধ্যে আকলিমা খাতুন ও আনোয়ারা খাতুনকে ডাঃ আবুল হোসেন মৃত্যুর অনেক আগেই বিয়ে দিয়ে গেছেন। তার মৃত্যুর পর ছোট মেয়ে মমতা খাতুনকে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিয়ে দেয়া হয়েছে। চার ছেলের মধ্যে তিন ছেলে বিবাহিত।

এ ব্যাপারে সম্প্রতি ভাষা সৈনিক আবুল হোসেনের বাড়ি চাটমোহর উপজেলার মথুরাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেল দুটি দোচালা ভাঙ্গা ঘরে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে তাদের বসবাস। আলাপকালে তার বিধবা স্ত্রী মোমেনা খাতুন কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমাদের খবর আর কে রাখে বাবা। ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন মরে গেছে, সেই সাথে আমরাও মরেছি। সরকারের পক্ষ থেকে কখনো কোন খোঁজখবর নেয় না। এই কথা কাকে বলবো? ভাষার জন্য, দেশের জন্য যিনি এতকিছু করে গেলেন আজ তার সংসারের খোঁজ কেউ নেয় না। একথা কাকে বলবো।’

তিনি আরো বলেন, ‘মাথা গোঁজার মত একটা ভালো ঘর নাই। একটু বৃষ্টি হলে ঘরে থাকা যায় না। ঝড়-বৃষ্টির দিনে সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়। দুই ছেলের সামান্য আয়ে সাত সদস্যের সংসার চালাতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে আব্দুল আজিজ বলেন, ‘বাবার অবদানকে সবাই ভুলে গেছে। আমাদের খোঁজ কেউ নেয় না। আমাদের কথা কার কাছে বলবো। বলারও লোক নেই, আমাদের কথা শোনারও লোক নেই। এখন বর্তমান সরকার যদি একটু সুদৃষ্টি দিয়ে আমার ছোট ভাই আলিম অথবা আরিফকে একটা ছোটখাটো চাকরির ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে সংসারটা অন্তত একটা কিনারা পাবে। আব্বার আত্মাও শান্তি পেতো।’

ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন সারাজীবন এলাকার মানুষের নানা সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের কাছে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতেন। কিন্তু ভুলেও নিজের অভাব আর কষ্টের কথা কাউকে কখনও বলেননি। কেউ জানতেও চায়নি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন সরকারই তার কোন খোঁজ নেয়নি। তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।

চাটমোহরের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিশির কুমার রায় ও নির্ঝর সাংস্কৃতিক সংগঠন তাকে সংবর্ধনা ও কিছু আর্থিক সহযোগিতা করেছিল। এর বাইরে কোনো সম্মাননা তিনি বা তার পরিবার পায়ন।

চাটমোহরের একমাত্র জীবিত ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট গৌরচন্দ্র সরকার বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেইতো এসেছিল স্বাধীনতা। ভাষা আন্দোলনে আবুল হোসেনের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তিনি মিছিলে সবার আগে থাকতেন। তার সংসারের বর্তমান যে দুরবস্থা তা আমরা জানি। আমরা মাঝেমধ্যে কিছু সহযোগিতা দেবার চেষ্টা করি। কিন্তু তাতে তাদের সমস্যার সমাধান হয় না। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আসে-যায়। কিন্তু আবুল হোসেনের মতো ভাষা সৈনিকদের স্মরণ করা হয় না। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, ‘মৃত্যুর পরও কি তিনি তার প্রাপ্য সম্মান পাবেন না?’

এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম শেহেলী লায়লা বলেন, চাটমোহরের প্রয়াত ভাষা সৈনিক আবুল হোসেনের কথা ও তার পরিবারের অবস্থার কথা শুনেছি। আমি বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে এনে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবো। ভাষার মাসে আমাদের প্রতিজ্ঞা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতার মাধ্যমে কিভাবে তাদের স্বাবলম্বী করা যায় প্রশাসনের কাছে সে চেষ্টা আমাদের থাকবে।

সর্বশেষ খবর

সারাবাংলা এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by