logo

শুক্রবার, ২৯ জানুয়ারি ২০১৬ . ১৬ মাঘ ১৪২২ . ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৭

আমাদের অহংকার আমাদের তারুণ্য
মালয়েশিয়ায় স্বর্ণপদকজয়ী রহিম
২৯ জানুয়ারি, ২০১৬
বিশ্বসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে আমাদের তরুণরা। অর্জন করছে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও। সম্প্রতি এসেছে তিনটি দারুণ সাফল্য। ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া, পাহাংয়ে বাংলাদেশি ছাত্র রহিম জিতেছেন স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক। পর্তুগালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ছাত্রী খাদ্যপণ্যে আইডিয়া প্রতিযোগিতায় হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। ব্রিটেনে আইডিয়া প্রতিযোগিতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর আইডিয়া হয়েছে প্রথম রানার্সআপ। তারুণ্যের এ সাফল্যগুলো নিয়ে

লিখেছেন নাদিম মজিদ

উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় রসায়নে আকৃষ্ট হন রহিম। এক যৌগের সঙ্গে আরেক যৌগের মিশ্রণে যে নতুন যৌগ তৈরি হয়, তা তার ভেতর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হলে দ্বিধাহীনভাবে বেছে নেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড পলিমার সায়েন্স। প্রকৌশল বিষয় বেছে নেয়ার কারণ রসায়নে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবেন।

স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারে উঠে ল্যাবে মনোযোগী হতে চাইলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষেই খুব বেশি ল্যাব ক্লাস ছিল না। বড় ভাইদের সহকারী হিসেবেই স্যারদের বলে-কয়ে ল্যাবে যাতায়াত অব্যাহত রাখলেন। বড় ভাইদের বিভিন্ন যৌগ এগিয়ে দিতেন। টেস্ট টিউব দিয়ে যৌগের মিশ্রণ দেখতেন।  এ বিষয়টিই নজর পড়েছিল  বিভাগের অধ্যাপক ড. মাকসুদুর রহমানের। কিছুদিন পরে বাংলাদেশি মাকসুদুর রহমান যোগ দেন ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া, পাহাংয়ে। স্নাতকের শেষ পর্যায়ে রহিমকে প্রস্তাব দেন, ‘শাবিপ্রবির ল্যাবে তোমাকে মনোযোগের সাথে কাজ করতে দেখেছি। তুমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে পার। আমি ভর্তি, স্কলারশিপের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’ মাকসুদুর রহমান নিজেও গবেষণায় মনোযোগী ছিলেন। তাই স্যারের প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং শতভাগ স্কলারশিপ নিয়ে মাস্টার্স পড়ার জন্য মালয়েশিয়ায় যান ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। শিল্পায়নের উপযোগী দুটো কোর্স নেন। একটি দূষিত পানি থেকে ব্যাটারির উপাদান আয়রন অক্সালেট তৈরি এবং অপরটি কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে জ্বালানি মিথানল তৈরি। সুপারভাইজর ড. মাকসুদুর রহমান। 

দূষিত পানি থেকে আয়রন অক্সালেট আইডিয়াটি নতুন। এ ধরনের কাজ শিল্পায়নে যুক্ত করতে পারলে শিল্পক্ষেত্র লাভবান হবে। আর কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে মিথানল তৈরির আইডিয়া পুরনো হলেও কাজ করছিলেন মিথানল পাওয়ার হার বাড়ানো নিয়ে।

প্রতিবছর মালয়েশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত হয় সিআইটিআরইএক্স প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে থাকে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।  গবেষণাকারী শিক্ষার্থীরা তাদের গবেষণার ফলাফল বিচারকদের কাছে তুলে ধরেন পোস্টার প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে। বিচারকেরা শিল্পায়নের উপযোগী এবং শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ দুটো মানদ-ে স্বর্ণপদক, রৌপ্যপদক এবং ব্রোঞ্জপদক দিয়ে থাকে। গত ৯ ও ১০ মার্চ ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া, পাহাংয়ে অনুষ্ঠিত হয় ক্রিয়েশন ইনোভেশন টেকনোলজি অ্যান্ড রিসার্চ এক্সপোজিশন (সিআইটিআরইএক্স) ২০১৫। বার্ষিক এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মো. রহিম উদ্দিন দুটো রিসার্চ পেপারের একটিতে স্বর্ণপদক এবং একটিতে রৌপ্যপদক অর্জন করেন।

প্রতিযোগিতায় ২৫ জন শিক্ষার্থী স্বর্ণ, রৌপ্য এবং ব্রোঞ্জ পদক পায়।  রহিম দুটো গবেষণায় পুরস্কৃত হন। একটি পান স্বর্ণপদক আরেকটি রৌপ্যপদক। পদকের পাশাপাশি সম্মাননা দেয়া হয়। বিচারকেরা তার গবেষণার প্রশংসা করেন।  বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে পিএইচডি করার জন্য আহ্বান জানায়।

নিজের পুরস্কৃত হওয়া সম্পর্কে রহিম জানান, ‘রসায়নের প্রতি আগ্রহ থেকে আমি এ দুটো বিষয় নিয়ে কাজ করছি। পুরস্কারের প্রতি আমি মনোযোগী ছিলাম না। গবেষণা দুটোর মূলে ছিলেন মাকসুদুর রহমান স্যার। আমি তার দেয়া পরামর্শ অনুসারে কাজ করেছি। উপযোগিতার দিক থেকে পুরস্কার পাওয়ায় আমি গর্বিত। মাস্টার্স কোর্স দুই বছরের। আপাতত তা শেষ করার চিন্তা করছি। পিএইচডি নিয়ে এখনো ভাবছি না।’ রহিম উদ্দিনের জন্ম কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। বাংলাদেশকে কেমন মিস করেন জানতে চাইলে জানান, ‘আমি বাংলাদেশকে প্রচুর মিস করি। বিশেষ করে শাবিপ্রবিকে। দেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতির জন্য খুব খারাপ লাগে।’

বাংলাদেশ গবেষণায় পিছিয়ে আছে। অথচ দেশ হিসেবে উন্নতি করতে গবেষণার বিকল্প নেই। ‘উন্নত দেশের সাথে পাল্লা দিতে হলে ল্যাবগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে। নতুন নতুন যন্ত্রপাতি যুক্ত করতে হবে। বর্তমানে যে যন্ত্রপাতি আছে, বাংলাদেশ তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চাচ্ছে। কিন্তু উন্নত দেশের ল্যাবগুলোতে নিত্যনতুন যন্ত্রপাতি যোগ হচ্ছে। পাশাপাশি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। মালয়েশিয়ায় একেকটি গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকে।’

মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি সম্পর্ক রয়েছে। ‘এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে  সময় নির্দিষ্ট করে বলে, স্যার আগামী এতদিনের মধ্যে এ ধরনের প্রোডাক্ট আমাদের তৈরি করে দেন। আমরা গবেষণার যাবতীয় ব্যয় বহন করছি।’ প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যারা স্বর্ণ বা রৌপ্যপদক পায়, তাদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে আইটিইএক্স। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। এখানেও দেয়া হয় স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্রোঞ্জ পদক। এ বছর মে বা জুন মাসে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।

রহিম ভবিষ্যতে রসায়নবিজ্ঞানী হতে চান। ইচ্ছে আছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায় জেটবিমানের ফুয়েল নিয়ে কাজ করার।

সর্বশেষ খবর

সৃজন এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by