logo

বুধবার, ২৯ আগস্ট ২০১৮, ১৪ ভাদ্র ১৪২৫, ১৭ জিলহজ ১৪৩৯

টিকিটে দুর্নীতি, নিয়োগে ঘুষ, তেলে চুরি
২৯ আগস্ট, ২০১৮
৯টার ট্রেনটি কয়টার ছিল? চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রুটের সন্ধ্যার লোকাল ট্রেনটি নিয়ে কেউ এই প্রশ্ন করলে একদমই বাড়াবাড়ি হবে না। দূরত্ব ৩৯ কিলোমিটার। সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। তবে ফতেহাবাদ হয়ে নাজিরহাটে পৌঁছাতে ট্রেনটির রাত ৯টা বেজে যায়। ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রেলপথে পাথর না দেওয়ায় ট্রেন চালাতে হয় সতর্ক থেকে, ধীরে ধীরে। ঘণ্টায় ১৩ কিলোমিটারের বেশি চলা সম্ভব হয় না। রেলপথটি সংস্কারের প্রকল্প নেওয়া হলেও দুই বছর কাজই হয়নি। পরে ঠিকাদারকেই বাদ দেওয়া হয়েছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, ষোলশহর-দোহাজারি ও ফতেহাবাদ-নাজিরহাট রেলপথ সংস্কারের জন্য ২৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পের মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে। তবে ঠিকাদার করোলা করপোরেশন দুই বছর কোনো কাজই করেনি। তবে অর্থ ঠিকই দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত গত বছরের অক্টোবরে ঠিকাদার বাতিল করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক গোলাম মোস্তফা কাজ না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, রেলপথে ব্যালাস্ট বা পাথর ফেলার কাজ রাজস্ব খাত থেকে এখন করতে হবে। এখানে আপাতত ৫৫ হাজার ঘনফুট পাথর ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প নেওয়ার আগে থেকে কিছুদিন পর পর্যন্ত রেল ভবনের সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ ছিল। তবে তা ‘সুবিধা ভাগাভাগির’ জন্য। কাজ হলো কী হলো না, উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যাওয়ার পর তার আর তদারকি করা হয়নি। এভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন রেলপথ নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পে অর্থ খরচ হলেও যাত্রীসেবা বাড়ছে না, রেলপথ উন্নত হচ্ছে না। কারণ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ লুটপাটেই মন দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের আগেই চুরি

গত ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈশ্বরদী-পাবনা-রাজশাহী রুটে ‘পাবনা এক্সপ্রেস’-এর চলাচল উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন বলে ট্রেনটি আগেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ঈশ্বরদী রেলস্টেশনের ইয়ার্ডে। দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রেন ছিল সিলগালা অবস্থায়। এর পরও পাওয়ার কারের ৫৪০১ নম্বর কোচের ভেতর থেকে ১২০ এম্পিয়ার ভোল্টের চারটি ব্যাটারি, ১৯৯ লিটার তেল, সুইচ, বৈদ্যুতিক কেবলসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ খোয়া যায়। অথচ সেখানে রেল নিরাপত্তা বাহিনীর সার্বক্ষণিক পাহারা ছিল বলে দাবি করছে রেলওয়ে। ঘটনার পর তদন্ত কমিটি করা হলেও অপরাধী শনাক্ত হয়নি। বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ঘটনার সঙ্গে রেলওয়ের পাকশী বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশ ছিল। রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহ পর তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। যাদের দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ব্যবস্থাপক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেও অভিযোগ উঠেছে, জড়িত রেল কর্মচারীদের আড়াল করার আয়োজন চলছে।

নিয়োগ নৈরাজ্য

রেলে ছোট থেকে বড় অপরাধ—সব ঢেকে রাখা হয় তদন্ত কমিটি করে। তদন্ত কমিটি তদন্তে নামে, কিন্তু অপরাধ হিসেবে গুরুদণ্ড আর দেয় না। কৌশলে দুর্নীতি আড়াল রাখার সংস্কৃতির কারণে রেলে নিয়োগ বাণিজ্য ডালপালা বাড়িয়েছে আরো বেশি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার পর তাঁরই এপিএসসহ রেলের কর্মকর্তারা নিয়োগ বাণিজ্যের ৭০ লাখ টাকাসহ ধরা পড়েছিলেন বিজিবি সদর দপ্তরে। ওই দুর্নীতির ঘটনায় মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বাধ্য হন প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তা ইউসুফ আলী মৃধাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের জেল হয়েছে। এর পরও নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি থেমে নেই। নিয়োগ পরীক্ষায় ঘুষ চলে, ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সময়ে তদন্তে নেমে এসব দুর্নীতির প্রমাণও পেয়েছে। যেমন—২০১৬ সালের জুলাইয়ে সহকারী স্টেশন মাস্টার পদে ২৫৭ জনের নিয়োগ ঘিরে দুর্নীতি হয়। নিয়োগ তালিকা প্রকাশের আগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বরের টেবুলেশন শিট করা হয়নি, কোটা ব্যবস্থারও অপপ্রয়োগ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ কমিটির কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় দুর্নীতিবাজ চক্র কমপক্ষে ১০ কোটি টাকার বাণিজ্য করে। পরীক্ষা দিয়েছেন, উত্তীর্ণও হয়েছেন, কিন্তু সব রকম যোগ্যতা থাকার পরও চাকরি পাননি—এ দাবি করে একজন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জমি বিক্রি করে চার লাখ টাকা জোগাড় করেছিলাম, তা দিয়ে চাকরি নিতে চেয়েছিলাম। তার পরও চাকরি হয়নি; কারণ ১০ লাখ টাকা দিতে পারিনি।’ ক্ষুব্ধ এই চাকরি প্রার্থী অভিযোগ করেন, পূর্ব ও পশ্চিম রেলে নিয়োগ পরীক্ষার আগেই এজেন্ট দিয়ে ঘুষ তোলা হয়ে থাকে।

সূত্র জানায়, কোটা না মেনে ফেনী জেলায় তিনজনের স্থলে ছয়জন, রাজশাহী বিভাগে ৩৫ জনের স্থলে ৪০ জন ও খুলনা বিভাগে ৩২ জনের বিপরীতে ৩৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মেধার ভিত্তিতে অর্ধশতাধিক নিয়োগ পেলেও বেশির ভাগ নিয়োগ হয়েছে ঘুষে। সূত্রের অথ্যানুসারে, নিয়োগ পেতে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে অনেককে। ঘুষ দিতে না পেরে চাকরি হয়নি—এমন একজন কালের কণ্ঠকে জানান, লিখিত পরীক্ষায় খারাপ করলেও ঘুষ দেওয়ার ওপর নির্ভর করে মৌখিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিক নম্বর দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, রেলে শিক্ষানবিশের একটি পদে নিয়োগ পরীক্ষা ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। তবে পরীক্ষার আগের দিন রাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায় এবং তা বাতিল করা হবে বলে নিয়োগ কমিটি থেকে জানানো হয়। বাতিল না করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৬ সালের জুনে। এ ক্ষেত্রেও ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরি পেতে রেল ভবনেও তদবিরকারীদের ভিড় ছিল।

এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা দুর্নীতি রোধে সচেষ্ট আছি।’ তিনি জানান, রেলে ৪০ হাজার ২৭৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে শূন্য আছে ১৫ হাজার ৫৫৮টি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৩ হাজার শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, মামলার কারণে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত করতে হয়।

তেল তেলেসমাতি

রেল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে দাবি করলেও যাত্রী ও মালবাহী বিভিন্ন ট্রেন থেকে তেল চুরি হচ্ছে বছরে গড়ে প্রায় দেড় কোটি লিটার। তেল চুরি করে বেচে দিচ্ছে সিন্ডিকেটগুলো। রেলওয়ে সূত্র জানায়, দিনে সাড়ে ৩০০ ট্রেন চলাচল করে পূর্ব ও পশ্চিম রেলে। এসব ট্রেনে পৌনে দুই লাখ লিটার ডিজেল লাগে। বছরে খরচ হয় ছয় কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার লিটার। তা থেকে বছরে দেড় কোটি লিটার তেল চুরি হচ্ছে। তেল চুরির বিভিন্ন ঘটনাার পর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এমন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ১৯০টি ট্রেনেই তেল চুরি হচ্ছে। ৭০টি চিহ্নিত স্থান থেকে ১৫০-এর বেশি সিন্ডিকেট এ তেল চুরির সঙ্গে যুক্ত। সবচেয়ে বেশি তেল চুরি হচ্ছে পাকশী রেল বিভাগে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শাখার তথ্যানুসারে, তেল চুরি করা হচ্ছে চলন্ত ট্রেন থেকে ও ট্রেন থামিয়ে দুভাবেই। ট্রেনের ইঞ্জিন, পাওয়ার কার ও লোকো শেড থেকে তেল চুরি করা হচ্ছে। রেলওয়ে বলছে—লোকো শেড থেকে নেওয়ার পর নির্দিষ্ট দূরত্বে ট্রেন চলাচল পর্যন্ত ট্রেনচালক হিসাব বুঝিয়ে দেন সংশ্লিষ্ট শাখাকে। কিন্তু এই হিসাবেই গরমিল থাকে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এখন তাই রেল ইঞ্জিন ক্যালিব্রেশন পদ্ধতি চালু করছে তেল চুরি ঠেকাতে। এ ক্ষেত্রে একটি ইঞ্জিন ১০ কিলোমিটার চলতে কতটুকু তেল লাগবে, তার হিসাব রাখা হবে। তেল ট্যাংকারের সঙ্গে স্কেলও থাকবে। তাতে চুরি ঠেকানো যাবে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তেল চুরি ঠেকাতে ইঞ্জিনের ট্যাংকারে তালা ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল, তাও সর্বত্র চালু করা হয়নি।

টিকিটের কালোবাজার

যাত্রীদের জন্য ট্রেনে সেবা পর্যাপ্ত নয়। ট্রেনে বাতি জ্বলে না, ফ্যান চলে না। আসন ছেঁড়া, এসি বগি কম। আর সবচেয়ে বড় যে বেদনার বিষয় তা হলো, ট্রেনের টিকিট সংকট পুঁজি করে রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের বাণিজ্য। এক সপ্তাহ আগে টিকিট চাইলেও অনেক সময় টিকিটপ্রার্থীদের বলা হয়—টিকিট নেই।

গত ঈদুল আজহার আগে ১৮ আগস্ট দুপুরে ঢাকা থেকে চলাচলকারী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য নাজনীন আক্তার টিকিট পাননি কাউন্টারে। তবে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ২৭১ টাকার এসি সিটের টিকিট পান ৯০০ টাকায়। এই যাত্রীর ঘটনার সূত্র ধরে জানা গেছে, ভিআইপি ও বিভিন্ন কোটায় ট্রেনের টিকিট রাখা হয় প্রায় ৩৮ শতাংশ। ট্রেন ছাড়ার দিন কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে এসব টিকিটের বড় অংশ গোপনে বিক্রি করেন বুকিং ক্লার্ক থেকে শুরু করে রেলের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। যাত্রার দিন শুরুর আগে রাত ১২টা বাজার পর সংরক্ষিত টিকিট রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ বের করে নিজেদের কাছে রাখে। ট্রেন ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা আগে চড়া দামে তা বিক্রি করে। রেলমন্ত্রী, রেলের মহাপরিচালক কালোবাজারে টিকিট বিক্রি হচ্ছে না দাবি করলেও এই টিকিট বিক্রি চলছে। কমলাপুর রেলস্টেশনে এ কাজে যুক্ত বুকিং ক্লার্ক মো. জামালকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। জামালের সহযোগীরা টিকিট বাণিজ্য করে হয়রানি করছে। কিন্তু তা দেখার কেউ নেই।

সৌজন্যে: দৈনিক কালেরকণ্ঠ

সর্বশেষ খবর

উপ-সম্পাদকীয় এর আরো খবর

    আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

    Developed by