logo

সোমবার, ১১ জানুয়ারি ২০১৬ . ২৮ পৌষ ১৪২২ . ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৭

ধানবিজ্ঞানী ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম
১১ জানুয়ারি, ২০১৬
তুষার জাহিদ
ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি ইনস্টিটিউটের অফিস। এখানকার বায়োটেকনোলজি বিভাগে কাজ করছিলেন মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম। কাজ করার সময় তার মোবাইল বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর। কল ধরার পর শুনতে পান, ‘স্যার, আমি নালিতাবাড়ীর দেলোয়ার হোসেন। স্যার, আমি আপনার জন্য আল্লাহর কাছে অনেক দোয়া করবো। ১৭-১৮ দিন পানির নিচে ধানগাছ ছিল। অথচ এ ধানগাছ টিকে গেছে।’

মির্র্জা মোফাজ্জল এ টেলিফোন কল পেয়েছেন তার উদ্ভাবিত ধান বিনা-১১-র জন্য। বন্যার পানির নিচে কয়েকদিন থাকলে যেখানে ধানগাছ মারা যায়, সেখানে ১৭-১৮ দিন থাকার পরেও এ জাতের ধানগাছ টিকে ছিল। মির্জা মোফাজ্জল জলবায়ুসহিষ্ণু ধান উদ্ভাবনে বাংলাদেশে পথিকৃৎ। পড়াশোনা করেছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছিলেন ভারত এবং ফিলিপাইনে।

২০০৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব ফিলিপাইন থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসেন। এবার নিজের দেশের মাটিতে কাজে লাগানোর পালা। মাথায় প্রচুর চাপ। আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির উচ্চতা বাড়ছে। লোনা পানি ঢুকে যাচ্ছে জমিতে। এসব সমস্যা সমাধানে সবাই চেয়ে আছে বিজ্ঞানীদের দিকে। ফিলিপাইন থেকে দেশে ফেরার সময় গ্রেগরিওকে বলে লবণসহিষ্ণু ১৫টি জাতের ধান নিয়ে এসেছিলেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় লাগানোর পর দেখা গেল, বাংলাদেশের পরিবেশে ৩টি জাতের ধান ঠিকমতো কাজ করছে। অন্য ধানগুলোর গাছ হয়, পাতা হয় না। এ তিনটির মধ্যে একটির আবার দানা হয় না। বাকি ২টি ধান নিয়ে ২০০৬ সাল থেকে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। ৪ বছর কাজ করার পর ২০১০ সালে এদের একটি ধানকে বিনা-৮ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। লবণ না থাকলে এ ধানের ফলন হেক্টরে ৮ টন আর থাকলে ফলন ৫ টন। ২০০৯ সালে বিজ্ঞানী মির্জা মোফাজ্জল ২০০ ধরনের ধানের চাষাবাদ তত্ত্বাবধান করতেন। সে সময় বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় আইলা। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২০ ধরনের ধান ছাড়া বাকি ধানগুলো মারা যায়। এবার এ ২০টি ধানকে আলাদা করে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে চাষ করেন। লবণাক্ত এলাকা। তবু একটি জাতের ধান টিকে গেছে। এ ধান নিয়ে কাজ করার সময় জাতীয় বীজ বোর্ডের মূল্যায়ন দলের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, ‘প্রচ- লবণাক্ত এলাকায় এ ধানের ফলন যদি প্রতি হেক্টরে ১ টনও হয়, তাহলে আমরা একে ধান হিসেবে ঘোষণা করবো।’ প্রথমবার সে এলাকায় এ ধানের ফলন ছিল ২ টন। ২০১২ সালে এ ধানকে বিনা-১০ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। লবণাক্ত এলাকায় প্রতি হেক্টরে এ ধানের ফলন ৬ টন আর লবণহীন এলাকায় ৮ টন। মোট ১৭ ধরনের ফসলের জাত উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তার কাজের সফলতার কারণ হিসেবে বলেন, ‘সময়নিষ্ঠতা এবং পরিশ্রম আমাকে সাফল্য দিয়েছে। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারছি।’ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন খরাসহিষ্ণু ধান এবং আউশের ভালো জাত উদ্ভাবনে কাজ করছি। ’

১৯৬৫ সালের ২০ মে মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার আগচারন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮০ সালে টাঙ্গাইলের বল্লা করোনেশন হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৮৩ সালে নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৮৭ সালে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি বিষয়ে স্নাতক এবং ১৯৮৮ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি ইনস্টিটিউট (বিনা)-তে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ২০০৯ সালে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে কাজ শুরু করেন। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের করনেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। তার স্ত্রী ড. শামছুন্নাহার বেগম (লুনা) একই প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এক পুত্র এবং কন্যা সন্তানের জনক।

সর্বশেষ খবর

তারুন্য এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by