Ajker Patrika
হোম > ইসলাম

মুহাম্মদ বিন কাসিম: ইসলামের ইতিহাসের এক সফল সমরনায়ক

মুফতি আবু আবদুল্লাহ আহমদ 

মুহাম্মদ বিন কাসিম: ইসলামের ইতিহাসের এক সফল সমরনায়ক
পাকিস্তানে মুহাম্মদ বিন কাসিম মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। ছবি: উইকিপিডিয়া

মুহাম্মদ বিন কাসিম (৬৯৫-৭১৫ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের এক বীর সেনানায়ক, যিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে সিন্ধু বিজয় করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর অসাধারণ সমর কৌশল, প্রজাস্বত্ব আচরণ ও ইসলামের প্রসার ঘটানোর জন্য তিনি প্রসিদ্ধ। তিনি শুধু একজন বিজয়ী সেনাপতিই ছিলেন না, বরং একজন বিচক্ষণ প্রশাসক, সুবিচারক ও সহনশীল শাসক ছিলেন।

প্রাথমিক জীবন

মুহাম্মদ বিন কাসিম ৬৯৫ খ্রিষ্টাব্দে (৭৫ হিজরি) আরবের তায়েফ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বনি সাকিফ গোত্রের সন্তান। তাঁর পিতা কাসিম বিন ইউসুফ ছিলেন সম্মানিত ব্যক্তি। শৈশবে তিনি বীরত্ব, নেতৃত্বগুণ ও সামরিক কৌশলে দক্ষ হয়ে ওঠেন। খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান এবং পরবর্তীতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের শাসনামলে তিনি দক্ষ সেনানায়কে পরিণত হন।

সিন্ধু বিজয়ের পটভূমি

সিন্ধু অঞ্চলে তখন রাজা দাহিরের শাসন চলছিল। যিনি অত্যাচারী ও অসহিষ্ণু শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মুসলিম ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা ও লুটপাটের কারণে উমাইয়া খলিফার অধীনস্থ ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ সিন্ধু আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে বেশ কয়েকটি ছোট অভিযান ব্যর্থ হলে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে একটি সুসজ্জিত বাহিনী পাঠানো হয়।

সিন্ধু বিজয় অভিযান

মুহাম্মদ বিন কাসিম মাত্র ১৭ বছর বয়সে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে সিন্ধু অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তাঁর বাহিনীতে ৬ হাজার ঘোড়সওয়ার, ৬ হাজার উটসওয়ার এবং অসংখ্য পদাতিক সেনা ছিল। তিনি যুদ্ধের কৌশল ও প্রযুক্তিতে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তাঁর সৈন্যরা যুদ্ধের সময় তেল মিশ্রিত আগুনের গোলক ব্যবহার করত, যা শত্রু বাহিনীর দুর্গ ভেঙে ফেলতে সাহায্য করত।

রাজা দাহিরের সঙ্গে যুদ্ধ সিন্ধুর অর্নার (বর্তমানে হায়দ্রাবাদ, পাকিস্তান) নামক স্থানে সংঘটিত হয়। মুহাম্মদ বিন কাসিমের দক্ষ নেতৃত্ব ও কৌশলগত চালের ফলে রাজা দাহির পরাজিত হন ও নিহত হন। এরপর মুহাম্মদ বিন কাসিম ক্রমান্বয়ে সমগ্র সিন্ধু অঞ্চল দখল করেন এবং ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

সিন্ধু বিজয়ের তাৎপর্য

ইসলামের প্রসার: মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজয়ের মাধ্যমে সিন্ধু অঞ্চলে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে। তিনি স্থানীয় জনগণকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করেন।

সুশৃঙ্খল প্রশাসন প্রতিষ্ঠা: তিনি বিজিত অঞ্চলে সুবিচার ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে স্থানীয় হিন্দু ও বৌদ্ধদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং কর ব্যবস্থা সহজ করা হয়।

মুসলিম শাসনের পথ তৈরি: মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে, যা পরবর্তীকালে সুলতানাত ও মোগল সাম্রাজ্যের উত্থানে সহায়ক হয়।

মুহাম্মদ বিন কাসিমের নীতি

মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। যথা—

নৈতিকতা ও সুবিচার: তিনি মুসলিম ও অমুসলিম সবার প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠা করেন।

সামরিক দক্ষতা ও নেতৃত্ব: তিনি প্রমাণ করেন যে কৌশলগত নেতৃত্বই যুদ্ধে বিজয়ের মূল চাবিকাঠি।

ধর্মীয় সহনশীলতা: বিজিত জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর ন্যায়বিচার ও সহনশীল মনোভাব মুসলিম শাসনের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।

নির্মম পরিণতি

মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজয়ের পর তিনি কিছু সময় সিন্ধুতে শান্তিপূর্ণ শাসন চালান। কিন্তু উমাইয়া খলিফা ও হাজ্জাজের মৃত্যুর পর নতুন শাসকেরা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। এক ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগে ৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে ইরাকে ডেকে পাঠানো হয় এবং সেখানে তিনি নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মুহাম্মদ বিন কাসিম ইতিহাসে এক মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি তাঁর অসাধারণ সামরিক প্রতিভা, সুবিচার ও ধর্মীয় সহনশীলতার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর সিন্ধু বিজয় শুধু ইসলামি ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায় নয়, বরং এটি ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি আজও এক মহান নেতা ও বিজয়ী হিসেবে স্মরণীয়।

সূত্র:

১. ইবনুল আসীর, আল-কামিল ফিত তারিখ

২. ইবনে খালদুন, মুকাদ্দিমা

৩. আবুল ফজল, আকবরনামা

৪. আল-বালাদুরি, ফুতুহুল বুলদান

আজ পবিত্র শবে কদর

শেখ সাদি: বিশ্বসাহিত্যের অমর কবি ও দার্শনিক

স্বাধীনতা আল্লাহর অপার দান

শাহ জালাল ইয়ামেনি: বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের প্রধানতম প্রাণপুরুষ

জাহান্নাম থেকে মুক্তির ৪ আমল

কোরআনের গল্প: নবী আইয়ুব (আ.)-এর অবিশ্বাস্য ধৈর্য

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি: উপমহাদেশে ইসলামি নবজাগরণের অগ্রদূত

হাদিসের আলোকে শবে কদর চেনার উপায়

দোয়া কবুলের ৪ শর্ত

যাদের জাকাত দেওয়া যাবে, যাদের যাবে না