বিজ্ঞানীরা তরঙ্গ ও গতিশীলতার গঠন এবং নকশা বোঝার ক্ষেত্রে এক বিরল অগ্রগতি অর্জন করেছেন। তরঙ্গের এই অনিয়ন্ত্রিত গতি-প্রকৃতি আমরা দেখতে পাই বায়ুপ্রবাহ, মহাসাগরের স্রোত, রাসায়নিক বিক্রিয়া, রক্তপ্রবাহ, ঝড়ের মেঘ, ধোঁয়ার কুণ্ডলী, এমনকি নক্ষত্রের প্লাজমাতেও।
এই প্রবাহ অত্যন্ত অস্থির ও অনিয়মিত হলেও বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে গাণিতিক সমীকরণ ও সুপারকম্পিউটারের মাধ্যমে এর নিখুঁত মডেল তৈরির চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি পুরোপুরি সফল হয়নি। ২০০ বছর ধরে বিজ্ঞানের জটিলতম সমস্যাগুলোর একটি হিসেবে রয়ে গেছে এটি।
এবার একদল আন্তর্জাতিক গবেষক নতুন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত। গবেষণাটি গত ২৯ জানুয়ারি সায়েন্স অ্যাডভান্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে এর প্রধান লেখক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী নিক গুরিয়ানভ বলেন, ‘আমরা এখনো সুপারকম্পিউটারের মাধ্যমে বাস্তবিক তরঙ্গপ্রবাহের নিখুঁত সিমুলেশন চালাতে পারি না। তাই বিমান উইং ডিজাইনের জন্য আমাদের এখনো বায়ুবাহিত পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সমস্যার সমাধানে গবেষণা আমাদের এক ধাপ এগিয়ে নিল।’
গবেষণাটি আগের প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে তরঙ্গ বিশ্লেষণ করেছে। এটি পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত গতির প্রকৃতি ভালোভাবে বোঝার সুযোগ দেয়। নতুন কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম ব্যবহার করে গবেষকেরা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই হিসাব সম্পন্ন করেছেন, যা সাধারণ সুপারকম্পিউটারে কয়েক দিন লাগত!
চীনের জিয়ামেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ংজিয়াং হুয়াং এই গবেষণা সম্পর্কে বলেন, ‘এই পদ্ধতি অত্যন্ত চমৎকার। এটি কম্পিউটার মেমোরি ব্যবহার ও হিসাবের জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে। কিন্তু এটি এখনো তরঙ্গের পুরো সমস্যা সমাধান করেনি।’
তরঙ্গ বিশ্লেষণকে বিজ্ঞানের প্রাচীনতম অনিষ্পন্ন সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন, ‘যখন আমি ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করব, আমি তাকে দুটি প্রশ্ন করব—আপেক্ষিকতা তত্ত্ব কেন? এবং তরঙ্গ কেন? আমি নিশ্চিত, প্রথম প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন।’
নিক গুরিয়ানভ বলেন, ‘আমাদের নতুন পদ্ধতিটি তরঙ্গ বিশ্লেষণের জন্য এক নতুন পথ খুলে দিয়েছে। তবে এখনো তরঙ্গের আসল রহস্য ভেদ করা সম্ভব হয়নি। এটি সম্ভব করতে হলে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অ্যালগরিদম ও কম্পিউটিং প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে।’
তিনি শেষ মন্তব্যে বলেন, ‘বহু প্রতিভাবান বিজ্ঞানী এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা এখনো সম্পূর্ণ সমাধানের কাছাকাছি আসতে পারিনি।’