যশোরের মনিরামপুর উপজেলার শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে পাঁচ বছর ধরে। দুই বছর আগে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রকৌশলী দপ্তর। পরে আর নতুন ভবন নির্মিত না হওয়ায় শ্রেণিকক্ষের সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মূল ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার পর তিন বছর আগে ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য সরকারি বরাদ্দের ২ লাখ টাকায় টিনের বেড়া ও টিনের চালার তিন কক্ষের একটি ঘর নির্মিত হয়। গেল বছর ঘূর্ণিঝড় রেমালে চালা উড়ে গেলে সেই ঘর ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিদ্যালয়ের কক্ষগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় গেল বছর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় জরুরি ভিত্তিতে দুই কক্ষের টিনের একচালা একটি ইটের ঘর নির্মিত হয়। এরপর থেকে কক্ষ দুটিতে দুই ধাপে পাঠদান করাচ্ছেন শিক্ষকেরা, যার মধ্যে একটি কক্ষে একসঙ্গে চলে দুই শ্রেণির পাঠদান।
শুধু যে শ্রেণিকক্ষের দৈন্যদশা তা নয়, ভারী বর্ষণ হলে বছরের তিন-চার মাস শ্রেণিকক্ষসহ মাঠে পানি জমে থাকে এই বিদ্যালয়ে। পাঠদানের ভালো পরিবেশ না থাকায় কয়েক বছর ধরে এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।
শিক্ষকদের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরে শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক্প্রাথমিকে ১৯ জন, প্রথম শ্রেণিতে ৯ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১১ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৯ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ১১ জন ও পঞ্চম শ্রেণিতে ১০ জন শিক্ষার্থী আছে।
গত সোমবার দুপুরে বিদ্যালয়ে গিয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ছয়জন, চতুর্থ শ্রেণিতে চারজন ও পঞ্চম শ্রেণিতে পাঁচজন শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে। এ সময় একই কক্ষের পূর্ব পাশে শিক্ষক আসাদুজ্জামানকে চতুর্থ শ্রেণির ইংরেজি ক্লাস ও শিক্ষক শরিফুল ইসলামকে তৃতীয় শ্রেণির সমাজ ক্লাস নিতে দেখা গেছে। এদিন প্রধান শিক্ষক সুনীল মল্লিককে বিদ্যালয়ে পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে চারজন শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিমু খাতুন বলে, বর্ষার সময় মাঠে পানি উঠে যায়। তখন রাস্তার পাশে বেঞ্চ দিয়ে ক্লাস হয়। আমাদের স্কুলে ভবন নষ্ট। এক শ্রেণিকক্ষে তৃতীয় শ্রেণির সঙ্গে ক্লাস করা লাগে। এতে সমস্যা হয়।
শিক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত হওয়ার পর থেকে ক্লাস নিতে আমাদের বেগ পেতে হচ্ছে। কক্ষসংকটে একই ঘরে একসঙ্গে দুই শ্রেণির ক্লাস নিতে হয়। ফলে যথাযথভাবে পাঠদান করা যায় না। এ ছাড়া এবার বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ের মাঠসহ শ্রেণিকক্ষ ও অফিসকক্ষে তিন-চার মাস পানি জমে ছিল। তখন রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে বেঞ্চ পেতে ক্লাস নিতে হয়েছে।’
শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শাওন হোসেন বলেন, ‘২০০৮ সালে আমি এই প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে বেরিয়েছি। তখন শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। এখন বিদ্যালয়ে পাঠদানের পরিবেশ না থাকায় শিক্ষার্থীর ভাটা পড়েছে।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুনীল মল্লিক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের মূল ভবন উপজেলা প্রকৌশলী দপ্তর দুই বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। এখনো নতুন ভবন নির্মাণ হয়নি। পুরাতন ভবনটি নিলাম হয়েছে। অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে আমাদের শিক্ষার্থী কমে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে মাঝে তিন-চার মাস ভালোভাবে ক্লাস করাতে পারিনি। তা ছাড়া বিদ্যালয়ের পাশে একটি মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। এই ওয়ার্ডে তিন গ্রামের মধ্যে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এসব কারণে শিক্ষার্থী বেশি পাওয়া যাচ্ছে না।’
মনিরামপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু মুত্তালিব আলম বলেন, ‘আমি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। পরিত্যক্ত ভবনের ছবি তুলে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। জেনেছি, কক্ষসংকটে বিদ্যালয়ে পাঠদানে সমস্যা হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে নতুন শ্রেণিকক্ষ তৈরির জন্য বিদ্যালয়টিতে দ্রুত ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে।’