বাংলাদেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি এবং চিকিৎসা অবহেলিত, বিশেষ করে শহর ও গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে তারা তো জানতেও পারে না যে তাদের মনের রোগ হয়েছে। জ্বর হলে চিকিৎসকের কাছে না গেলেও ঝটপট প্যারাসিটামল খেয়ে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করেন আপনি, কিন্তু কখনো কি খোঁজ নিয়েছেন মনের স্বাস্থ্য কেমন আছে? ২০১৯ সালে মহামারির আগে সারা বিশ্বে আনুমানিক আটজনের মধ্যে একজন মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। একই সময়ে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সেবা, দক্ষতা এবং তহবিল ছিল প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। কোভিড-১৯ মহামারি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সংকট তৈরি করেছে, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চাপ বাড়িয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য দুর্বল করেছে। মহামারির প্রথম বছরে উদ্বেগ ও হতাশাজনিত ব্যাধি উভয় মিলে ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সেবাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যার জনসংখ্যার ঘনত্ব অন্য যেকোনো বড় দেশের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। গ্রামের তুলনায় শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। নানা কারণে নগরবাসীর মানসিক স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য প্রভাবিত করে এমন কয়েকটি কারণের মধ্যে রয়েছে জনসংখ্যার ঘনত্ব, আবাসন, অর্থনৈতিক অবস্থা, কর্মসংস্থান, জীবনের অভিজ্ঞতা ও রোগের বোঝা। সাধারণ জনগণের আর্থিক অবস্থা প্রভাবিত করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে। করোনাকালে এ সমস্যা আরও প্রকটতর হয়। মহামারির প্রাথমিক পর্যায়ে, অনেক হাসপাতাল কোভিড-১৯-এর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং পরীক্ষার সুবিধা সীমিত ছিল। এই পরিস্থিতি অনেক বাংলাদেশির মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করেছে। ২৬ মার্চ ২০২০ থেকে লকডাউন কার্যকর হওয়ার পর সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। দিনের পর দিন মানুষ ঘরবন্দী থাকতে বাধ্য হয়। আর এসব কারণে বিষণ্নতাসহ অন্যান্য মানসিক রোগ দানা বাঁধতে থাকে মানুষের মাঝে। সাধারণ বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবসংক্রান্ত একটি গবেষণা থেকে দেখা যায়, সাধারণ জনসংখ্যার মধ্যে একাকিত্ব ৭১, বিষণ্নতা ৩৮, উদ্বেগ ৬৪ ও ঘুমের ব্যাঘাতের প্রাদুর্ভাবের হার ছিল ৭৩ শতাংশ।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রথম জাতীয় জরিপ পরিচালিত হয়েছিল ২০০৩-০৫ সালে। আর দেশব্যাপী প্রতিনিধি সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছিল ২০১৯ সালে। করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯ মহামারি বাংলাদেশি জনগণের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিষণ্নতা ৫৭ দশমিক ৯, স্ট্রেস ৫৯ দশমিক ৭ ও উদ্বেগ ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ উপসর্গ এখন প্রাক্-মহামারি হারের তুলনায় অনেক বেশি। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত বাংলাদেশে শিশুদের ওপর একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা যায়, তাদের মানসিক অসুস্থতা ১৩ দশমিক ৪ থেকে ২২ দশমিক ৯ শতাংশের মধ্যে। ২০১৯ সালের দেশব্যাপী প্রতিনিধি সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের আত্মহত্যার প্রবণতা কম। বাংলাদেশে শূন্য দশমিক ২ এবং শূন্য দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের আছে বলে জানা যায়। ২০১৯ সালের গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বিষণ্নতার বিস্তার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ১৫ মাসের মধ্যে উদ্বেগের প্রবণতা ২৭ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর ও আধা শহুরে স্কুলের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ২০১৮ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ হতাশার লক্ষণে ভুগছে, যার মধ্যে মেয়েরা ৪২ দশমিক ৯ এবং ছেলেরা ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৩ সালের একটি সমীক্ষা থেকে জানা গেছে যে শহরের স্কুলগুলোতে ২৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর বিষণ্নতার লক্ষণগুলো দেখা যায়। এর মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা ৩০ আর ছেলেদের ১৯ শতাংশ। ২০১৩ সালের অপর এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতার প্রবণতা ছিল ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির বিষয়টি মূলত শহরকেন্দ্রিক। সারা দেশ থেকে প্রতিবছর আনুমানিক ৭ হাজার শিক্ষার্থী চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করলেও মনোচিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন মাত্র কয়েকজন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাগুলো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সাইকিয়াট্রিক নার্স ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের দ্বারা দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তাঁদের মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় চোখে পড়ে না। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাগুলো প্রায়ই বিভাগীয় স্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা শহরের মধ্যে অবস্থিত তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মাত্র ২৬০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ১৬২ মিলিয়নের দেশে সেবা দিচ্ছেন। তাই জনসংখ্যার বেশির ভাগই মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা গ্রহণ করতে পারছে না।
বাংলাদেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি এবং চিকিৎসা অবহেলিত, বিশেষ করে শহর ও গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে তারা তো জানতেও পারে না যে তাদের মনের রোগ হয়েছে। বস্তিগুলোতে অন্যান্য অসংক্রামক রোগের পাশাপাশি মানসিক রোগের ব্যাপারেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অন্তত একজন মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শক থাকা জরুরি। যেহেতু এ ক্ষেত্রে জনবলের অভাব একটি বড় সমস্যা, তাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাড়াতে হবে জনবল। জনসাধারণের মানসিক স্বাস্থ্য সুবিধার অভাব, দক্ষ মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের অভাব ইত্যাদি কারণ বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদানে বড় বাধা। জাতীয় মনোসামাজিক কাউন্সিল নীতিমালায় এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ মেলে। আমরা প্রত্যাশা করি, নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত হোক।
ডা. মো. শামীম হায়দার তালুকদার, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ,ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ