Ajker Patrika
হোম > ইসলাম

কাসেম নানুতুবি (রহ.): ভারতবর্ষে ইসলামি শিক্ষার পুনর্জাগরণের অগ্রদূত

আবদুল আযীয কাসেমি

কাসেম নানুতুবি (রহ.): ভারতবর্ষে ইসলামি শিক্ষার পুনর্জাগরণের অগ্রদূত
ভারতের দেওবন্দে কাসেম নানুতুবির (রহ.) সমাধি। ছবি: সংগৃহীত

মাওলানা কাসেম নানুতুবি (১৮৩৩–৮০) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি শিক্ষার পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি বৈপ্লবিক শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রাথমিক জীবন

তার নাম মুহাম্মদ কাসেম বিন আসাদ আলি সিদ্দিকি নানুতুবি। উত্তর প্রদেশের মোজাফফরনগর জেলায় নানুতা নামক গ্রামে ১২৪৮ হিজরিতে মোতাবেক ১৮৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই অসাধারণ মেধা ও জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা তিনি নিজ গ্রামে অর্জন করেন। উচ্চতর শিক্ষার জন্য দিল্লি গমন করেন। সেখানে মাওলানা মামলুকুল আলি নানুতুবির কাছে প্রায় সব শাস্ত্র শেখেন। হাদিস শাস্ত্রের পাঠ গ্রহণ করেন শায়খ আব্দুল গনি মুজাদ্দিদির কাছে। আরও পাঠ করেন শায়খ মুহাদ্দিস আহমদ আলি সাহারানপুরির কাছে। তিনি হাদিস, তাফসির, ফিকহ, দর্শন এবং অন্যান্য ইসলামি বিজ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। বিশেষত যুক্তিবিদ্যায় তিনি অনন্য অবস্থান তৈরি করেন।

সংগ্রামী কর্মজীবন

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি মুহাদ্দিস আহমদ আলি সাহারানপুরির প্রতিষ্ঠিত ‘আহমদি প্রকাশনী’তে কাজ শুরু করেন। সেখানে বিভিন্ন বইয়ের সম্পাদনা ও টীকা লেখার কাজ করতেন। বিশেষত সহিহ বুখারি সম্পাদনার কাজে বিশেষভাবে অংশগ্রহণ করেন। শেষ ষষ্ঠাংশ টীকার কাজ তিনি সম্পাদন করেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি এ কাজে পারদর্শিতার স্বাক্ষর রাখেন। পরবর্তী জীবনেও তিনি প্রকাশনীর কাজ পুরোপুরি ত্যাগ করেননি। দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পরও তিনি মিরাঠ শহরের প্রকাশনা সংস্থা ‘মাতবায়ে মুজতাবাই’তে কাজ করার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

১৮৫৭ সালে যখন পুরো ভারতব্যাপী ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়, তখন উত্তর প্রদেশের থানাভবন, চামেলি, মুজাফফরনগরকে কেন্দ্র করে হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কির নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী বাহিনী গঠিত হয়। সেখানে মাওলানা কাসেম নানুতুবি ও রশিদ আহমদ গাঙ্গুহিও নেতৃত্ব প্রদান করেন। ১৮৫৭ সালের ১০ নভেম্বর শামেলিতে অনুষ্ঠিত হয় কঠিন যুদ্ধ। যদিও এ যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী আধুনিক অস্ত্রের কারণে জয়ী হয়; তবে এটি স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা

১৮৬৬ সালে কাসেম নানুতুবি ও তাঁর সহযোগী মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি অন্যান্য আলেমদের সহায়তায় দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন। এ প্রতিষ্ঠানটি উপমহাদেশে ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ইসলামি শিক্ষার পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেওবন্দের পাঠ্যক্রমে কোরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির ও অন্যান্য ইসলামি জ্ঞানের পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও গণিতও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সমাজসংস্কার

কাসেম নানুতুবি শুধু একজন শিক্ষাবিদই ছিলেন না, ছিলেন একজন সমাজসংস্কারকও। খুবই বিনয়ী ছিলেন। লোকসমাজে নিজেকে জাহির করা খুবই অপছন্দ করতেন। আলেম সুলভ পোশাক পরিচ্ছদও তিনি পরিধান করতেন না। পরবর্তীতে পীর হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কির নির্দেশে তিনি জনগণের মধ্যে সংস্কার মূলক কাজ শুরু করেন। এতে মুসলমানরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়। বিশেষ করে যখন খ্রিষ্টান মিশনারি ও হিন্দু বুদ্ধিজীবী সমাজ কর্তৃক মুসলমানদের ধর্মহীন করার চক্রান্ত শুরু হয়, তখন তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এ চক্রান্তের মোকাবিলা করেন। ভারতজুড়ে বিভিন্ন স্থানে তিনি খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হন এবং তাদের পরাজিত করেন। এসব বিতর্কের বিবরণ বেশ কয়েকটি বইয়ে সংকলিত হয়েছে।

লেখালেখি

কাসেম নানুতুবি (রহ.) বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেগুলো ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ইসলামের ওপর আরোপিত নানা আপত্তির অপনোদন ও খণ্ডনে বেশ কয়েকটি বলিষ্ঠ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচনাসমগ্র পাকিস্তান থেকে বিশের অধিক ভলিয়মে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখাগুলোতে ইসলামি আইন, দর্শন, তাফসির ও হাদিসের গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। তাঁর রচনাগুলো আজও ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক ও সমাদৃত।

মৃত্যু

১৮৮০ সালে কাসেম নানুতুবি (রহ.) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ আজও বিশ্বব্যাপী ইসলামি শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা আজও লাখ লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

মা-বাবার খেদমতে জান্নাত লাভের সুযোগ

প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা ইমানের দাবি

দাওয়াত খেয়ে যে দোয়া পড়তেন নবীজি (সা.)

ঈদুল ফিতরের নামাজের নিয়ত ও নিয়ম

নতুন পোশাক পরিধানের দোয়া

ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপনে ইসলামের নির্দেশনা

ইবনে তাইমিয়া (রহ.): ইসলামি জ্ঞানের উত্তাল সমুদ্র

জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.): অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি ব্যক্তিত্ব ও লেখক

রমজান আমাদের যা শেখায়

হাসান বসরি (রহ.): সুফিবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ