Ajker Patrika

মানিকগঞ্জের শত বর্ষের ঐতিহ্য গাঁওয়ালী শিন্নি উৎসব শুরু

ঘিওর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি 
গাঁওয়ালী শিন্নি বিতরণ করা হচ্ছে। মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর-মোল্লাপাড়া গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা
গাঁওয়ালী শিন্নি বিতরণ করা হচ্ছে। মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর-মোল্লাপাড়া গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা

মানিকগঞ্জের অন্তত ৫০ গ্রামে গাঁওয়ালী শিন্নি উৎসব শুরু হয়েছে। শত বছর ধরে চলে আসা এ ঐতিহ্য অনেকটা খর্ব হলেও শিন্নি বিতরণ উৎসব উপলক্ষে মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়।

আয়োজক ও স্থানীয় প্রবীণদের কাছে জানা যায়, রোগব্যাধি, বালা-মুসিবত থেকে মুক্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় এ শিন্নি বিতরণ করা হয়। স্থানীয়দের কাছে যা গাঁওয়াইল্যা শিন্নি এবং খোদার শিন্নি নামেও পরিচিত।

আজ বুধবার ঘিওরের শ্রীধর নগর, কাউটিয়া, জেলা সদরের সেওতা, শিবালয় উপজেলার বুতুনী, দৌলতপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর, মোল্লাপাড়া গ্রামবাসীদের আয়োজনে শিন্নি বিতরণ উৎসব হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষদের উপস্থিতিতে শিন্নি বিতরণ উৎসব পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলা।

আয়োজকদের একজন পশ্চিম সেওতা গ্রামের প্রবীণ মোহাম্মদ আলী বলেন, মূলত কার্তিক মাসজুড়ে সন্ধ্যার দিকে রোগমুক্তি কামনায় এমন আয়োজন চলে আসছে প্রায় শত বছর ধরে। এলাকাবাসীর সার্বিক তদারকি ও সহায়তায় গাঁওয়ালী শিন্নি রান্না করা হয়। অর্থনৈতিক অবস্থাভেদে জনপ্রতি ১০-৫০০ টাকা ও সব বাড়ি থেকে চাল সংগ্রহ করা হয় এ উৎসব উপলক্ষে। শিন্নি উপলক্ষে গ্রামজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

চলতি কার্তিক মাসে মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয়, সদর, সিংগাইর, হরিরামপুর, সাটুরিয়া উপজেলার অন্তত ৫০ গ্রামে পালিত হয় এই শিন্নি উৎসব। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত পনেরো দিনে ঘিওর উপজেলার নালি, কুন্দুরিয়া, দিয়াইল, বালিয়াখোড়া, গোয়ালাডাঙ্গী, নয়াচড়, সদর উপজেলার পশ্চিম সেওতা, হাটিপাড়া, আটিগ্রাম, শিবালয় উপজেলার রুপসা, ইন্তাজগঞ্জ, মহাদেবপুর, শাহিলী গ্রামে শিন্নি বিতরণ উৎসবে নারী পুরুষসহ বিভিন্ন পেশার শত শত মানুষের সমাগম ঘটেছে।

জানা গেছে, নতুন চাল, চিনি আর গরুর দুধে এই শিন্নি রান্না করা হয়। শিন্নিতে কোনো লবণ দেওয়ার নিয়ম নেই। সন্ধ্যার দিকে আশপাশের গ্রাম থেকে আগত মানুষজনের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তবে অনেক এলাকায় আশপাশের মানুষ ছাড়াও নিজের গ্রামের মানুষজনও শিন্নি খেয়ে থাকেন। শিন্নি উৎসবের আগে বেশ কয়েক দিন গ্রামবাসী রাতে জিকির-আসগার করেন।

শিন্নি আয়োজক মোল্লাপাড়া এলাকার মিন্টু মোল্লা বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকেই এ শিন্নি হয়। বালা-মুসিবত ও কলেরা থেকে বাঁচার জন্য এ শিন্নির আয়োজন করতেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা। তারই ধারাবাহিকতায় এখনো চলমান আছে এ উৎসব।’

রামচন্দ্রপুর এলাকার আমোদ আলি বলেন, ‘কথিত আছে প্রায় শত বছর আগে গ্রামে কলেরার প্রাদুর্ভাব হয়। অনেক মানুষ মারা যাওয়ার পর এক ফকির এ ধরনের শিন্নির আয়োজন করার পরামর্শ দেন। উৎসব পালন শেষে গ্রামবাসী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত গ্রামের লোকজন এ উৎসব পালন করে আসছেন।’

গাঁওয়ালী শিন্নি রান্নায় ব্যস্ত কয়েকজন। মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর-মোল্লাপাড়া গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা
গাঁওয়ালী শিন্নি রান্নায় ব্যস্ত কয়েকজন। মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর-মোল্লাপাড়া গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা

কাউটিয়া গ্রামের প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রের পরিচালক দেলোয়ার জাহান বলেন, আমাদের এ বছরের কার্তিক মাসের শিন্নি খেতে গ্রামের ১৮০ ঘরের প্রায় ৫০০ মানুষসহ আশপাশের লোকজন এসেছেন। এলাকায় ঘুরে ঘুরে চাল ও টাকা সংগ্রহ করে শিন্নি রান্না করে, সবাই মিলে মাটিতে বসে শিন্নি খেয়ে আসছেন।

বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল আওয়াল খাঁন বলেন, এই উৎসবের মাধ্যমে এলাকার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকত। শত বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে এই উৎসব। তবে আধুনিকতার যুগে অনেকেই এটাকে কুসংস্কার বলে থাকেন। কাল পরিক্রমায় এই গাঁওয়ালী শিন্নির প্রচলন অনেক কমে যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত