Ajker Patrika

বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিন’ রাজনীতি

কলকাতা প্রতিনিধি
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২২, ২২: ১৭
বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিন’ রাজনীতি

বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড় চলছে ভারতে। ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বিরোধী শিবিরের সব দলই কম বেশি দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। তবে দলবদল করে শাসক শিবিরে নাম লেখালেই সমস্ত অভিযোগ ধামাচাপা। তাই বেড়ে গিয়েছে দলবদলের হার। শাসক দলের ‘ওয়াশিং মেশিন’ ব্যস্ত দলবদলকারীদের গায়ে থাকা কালির দাগ তুলতে। 

ভারতের একাধিক তদন্তকারী সংস্থার অতি সক্রিয়তায় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে বিরোধী শিবিরের নেতাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। তাদের দাবি, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিও মোদির শাসনামলে কম্পমান! দিল্লি থেকে মুম্বাই, কলকাতা থেকে তিরুবন্তপুরম সর্বত্রই একই ছবি। 

ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ব্যস্ত বিরোধী শিবিরের নেতাদের দুর্নীতি প্রমাণে। অথচ, শাসক দল বা জোটের নেতারা বহাল তবিয়তে। তাঁদের টিকিটিও স্পর্শ করা হচ্ছে না। এমনকি, ‘বিরোধী শিবির ছেড়ে শাসক জোটে এলেও নাকি সাত খুন মাফ! বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে সব পাপ ধুয়ে সাফ!’ —এমন কটাক্ষ হজম করতে হচ্ছে শাসক দলকে। 

কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, তদন্তের নামে প্রকৃতপক্ষে করা হচ্ছে সরকারের সমালোচকদের। বিজেপির আমলে গণতন্ত্র আক্রান্ত হয়েছে। এসব নিয়ে দেশটির পার্লামেন্টেও আওয়াজ তুলেছেন বিরোধী এমপিরা। আর তাই বর্ষাকালীন অধিবেশন বিঘ্নিত হচ্ছে প্রতিদিন। 

দিল্লিতে আম আদমি পার্টির বর্ষীয়ান নেতা ও মন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন বেশ কিছুদিন ধরেই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আটক। মহারাষ্ট্রে সম্প্রতি বন্দী হয়েছেন শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত। মন্ত্রী থাকাকালেই গ্রেপ্তার হন দুই এনসিপি নেতা অনিল দেশমুখ এবং নবাব মালিক। অনিল ছিলেন মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও শাসক দল তৃণমূলের মহাসচিব শিল্পমন্ত্রী থাকা অবস্থায় গ্রেপ্তার হন ইডির হাতে। কেরালার বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী পিলারাই বিজয়ননের মতো মানুষের বিরুদ্ধেও স্বর্ণ পাচারের অভিযোগকে মাঝেমধ্যেই খোঁচানো হচ্ছে। অন্ধ্রপ্রদেশ বা তামিলনাডুতেও সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে তদন্তকারী সংস্থা। কংগ্রেস শাসিত রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে একই ছবি। গোটা দেশেই কেন্দ্রীয় সরকারের তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই বা ইডি বিরোধী দলের নেতাদেরই নিশানা করছে। অথচ শাসক দলের কাউকেই তাঁদের নজরে দেখা যাচ্ছে না। 

এমনকি, এক সময়ে কংগ্রেসের ডাকসাইটে নেতা ও মন্ত্রী এবং বর্তমানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বা সাবেক তৃণমূল নেতা ও মন্ত্রী এবং বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়েও নীরব সিবিআই-ইডি। তাঁদের দুজনের বিরুদ্ধেই রয়েছে আর্থিক অপরাধের একাধিক অভিযোগ। অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে বন্ধ সিবিআই বা ইডির সক্রিয়তা। বিজেপিতে যোগদানের আগে হিমন্তের বিরুদ্ধে চিটফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে সোচ্চার ছিলেন বিজেপি নেতারা। তদন্তকারীরা তলব করেছিলেন তাঁর স্ত্রীকে। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে লুইস বার্গার কোম্পানি থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ। এমনকি, হিমন্তের স্ত্রীর সংস্থা কোভিড মহামারির সময় অনেক বেশি টাকায় করোনা চিকিৎসার সামগ্রী সরবরাহ করেছে বলেও অভিযোগ। কিন্তু এখন আর তিনি নেই গোয়েন্দাদের নজরে।

ঠিক তেমনি বিজেপি এক সময়ে ভিডিও ক্লিপিংস দেখিয়ে অভিযোগ করেছিল, শুভেন্দু নারদা গণমাধ্যমের স্টিং অপারেশন থেকে টাকা নিচ্ছেন। এই স্টিং অপারেশনে টাকা নিতে গিয়ে ধরা পড়ে তৃণমূলের অন্য নেতা-মন্ত্রীরা গ্রেপ্তার হলেও রহস্যজনকভাবে ছাড় পান শুভেন্দু। বিজেপিতে যোগদানের কারণেই নাকি তাঁর সাত খুন মাপ! ওয়াশিং মেশিন বিজেপি? 

খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে রয়েছে রাফাল যুদ্ধ বিমান কেনা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। কোভিড মোকাবিলায় পিএম কেয়ারস ফান্ড নিয়েও তিনি সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে জয় শাহের সম্পদ বৃদ্ধিও বিরোধীদের কাছে শুধু আর্থিক অপরাধই নয়, বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশ বা আসামে পুলিশের ভুয়া সংঘর্ষ বা হেফাজতে মৃত্যুর তদন্ত হচ্ছে না। 

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বহুবার মন্তব্য করেছেন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই আসলে খাঁচায় বন্দী তোতাপাখি। তাদের স্ব–শাসনের কথা বলা হলেও তদন্ত চলে সরকারের মর্জিতেই। এখন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে শাসক দলের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের অভিযোগ বাড়ছে। 

মোদী সরকারের এমন ভূমিকা নিয়ে তুমুল হট্টগোল চলছে জাতীয় সংসদে। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের মতে, ‘বিজেপির ভূমিকা ওয়াশিং মেশিনের মতো। তাদের দলে যোগ দিলেই সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ সাফ হয়ে যায়। অন্যের দল ভাঙ্গাতেই বিজেপি তাদের ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার করছে।’ কুণালের সাফ কথা, ‘বিরোধীদের দল বা সরকার ভাঙাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।’ 

কংগ্রেস নেতা রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা অনেক দিন ধরেই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিজেপির শাখা সংগঠন বলে কটাক্ষ করে চলেছেন। বিজেপি অবশ্য এই সব অভিযোগ মানতে নারাজ। দলের মুখপাত্র সম্বিত পাত্রের পাল্টা দাবি, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি হাতে নিয়েছে মোদী সরকার। তাই বিরোধীরা নাকি এখন দিশেহারা। আর কংগ্রেস ব্যস্ত গান্ধী পরিবারকে বাঁচাতে।’ 

এর আগে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে ৫ দিনে ৫০ ঘণ্টা জেরা করেছে ইডি। কংগ্রেস সভানেত্রী ৭৫ বছরের অসুস্থ সোনিয়া গান্ধীকেও দুবার হাজিরা দিতে হয়েছে ইডির দপ্তরে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকার টাকা নয়ছয়ের। অথচ, সাবেক মন্ত্রী ও প্রবীণ নেতা পি চিদাম্বরমের মতে, ‘মোদী সরকারের আমলেই ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় কংগ্রেস নেতাদের ক্লিন চিট দেওয়া হয়।’ অথচ সংসদের অধিবেশন চলার সময় হাজিরা দিতে ডেকে পাঠানো হচ্ছে রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গেকে। খাড়গের অভিযোগ, ‘সংসদীয় রীতিনীতির প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা নেই মোদী সরকারের।’ তিনি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার অতি সক্রিয়তা নিয়ে সংসদে আলোচনারও দাবি তোলেন। 

কংগ্রেসসহ বিরোধীরা একাধিক মুলতবি প্রস্তাব জমা দিলেও সরকার আলোচনায় রাজি নয়। বিজেপির মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের পাল্টা দাবি, দুর্নীতি দমনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সরকার। তাই স্বশাসিত সংস্থাগুলি স্বাধীনভাবে কাজ করছে বলে মনে করেন তিনি। সেই সঙ্গে তাঁর পাল্টা অভিযোগ, কংগ্রেসের আমলেই বিরোধীদের ঘায়েল করতে ব্যবহৃত হতো আইনরক্ষকদের। 

অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই বিরোধীদের বিরুদ্ধে কলঙ্কের প্রলেপ দিন দিন বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি পাল্টা আলকাতরা থিওরির কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় দৃশ্যতই বিরোধীরা দুর্নীতির জাঁতাকলে বিদ্ধ। রাহুল গান্ধী বা শারদ পাওয়াররা যাই বলেন না কেন, কেলেঙ্কারির বহর বেড়েই চলেছে। আর সেই কেলেঙ্কারির জাল থেকে অনেকেই বিজেপিতে যোগ দিয়ে মুক্তও হচ্ছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। তাই দল ভাঙানোর খেলায় বা বিরোধীদের ঘায়েল করতে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের অভিযোগও ক্রমশই সাধারণ মানুষের কাছে নেতাদের দুর্নীতির মতোই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে ভারতে। 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এখন টিভির ঘটনা সমঝোতার চেষ্টা করবেন তথ্যমন্ত্রী

ড. ইউনূস এখন কোথায় আছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী উঠবেন কোথায়?

২৬ ফেব্রুয়ারি বসতে পারে সংসদের প্রথম অধিবেশন, সভাপতিত্ব করবেন কে

বৈধ সুবিধাকে অস্বীকার করে জনগণের সামনে সাধু সাজা হচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা হলেন আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত