অরুণ কর্মকার
এমনিতেই ফেব্রুয়ারি এলে রাজপথগুলো আগুনরাঙা হয়ে ওঠে। বাতাসে গনগনে ফুলকি ছড়াতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারি এ দেশের প্রতিটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় ১৯৫২ সালে তার রচিত পথের কথা। এবার, এই ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার সঙ্গে বাড়তি যুক্ত হয়েছে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের উত্তাপ। মানুষ এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে বাংলাদেশ এক রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘিরে সৃষ্ট নানামুখী টানাপোড়েন ওই উত্তাপ ছড়ানোর পাশাপাশি কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিচ্ছে।
নতুন মেরুকরণের প্রধান উপাদান হলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে নতুন একটি রাজনৈতিক দল এখন আত্মপ্রকাশের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। একই সঙ্গে গঠনপ্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন দলের নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে। অপেক্ষাকৃত তরুণদের উদ্যোগ ও সমন্বয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ায় হয়তো এ ধরনের টানাপোড়েন একেবারে অস্বাভাবিক নয়। তবে বিষয়টি যেভাবে প্রকাশ্যে এসেছে এবং আসছে, তাতে স্বাভাবিক মনে করে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
কারণ, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শীর্ষ নেতাদেরও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন। তাতে এ কথা স্পষ্ট যে নতুন দলের উদ্যোক্তা এবং পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে নেতৃত্বের বিষয়ে একাধিক বলয় তৈরি হয়েছে। আত্মপ্রকাশের আগেই এই অবস্থা নেতাদের জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তরুণদের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে একটি উদারপন্থী (তাঁরা অবশ্য মধ্যপন্থী বলেছেন) রাজনৈতিক দল হওয়া সময়ের দাবি। তাঁদের সেই দাবি মেটাতে হবে। নতুন দল অবশ্য আরও দু-একটি হওয়ার কথা শোনা গিয়েছিল। এখনো যে শোনা যাচ্ছে না, তা-ও নয়। তবে সেসব বাতাসেই ভেসে বেড়াচ্ছে। হয়তো এমন দলগুলোর উদ্যোক্তারা বিষয়টি আড়ালে রেখেই শেষ মুহূর্তে প্রকাশিত হতে চান।
এই মেরুকরণ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো বিএনপির প্রতিক্রিয়া। নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ছয় সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের একটি অংশ বিএনপিকে বোধ হয় কিছুটা উদ্বিগ্ন করেছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, কোন রাজনৈতিক দল কতটুকু সংস্কার চায়, তা লিখিতভাবে জানাতে হবে এবং তিনি তা দেশবাসীকে জানানোর জন্য ওয়েবসাইটে দিয়ে দেবেন। এরপর বিএনপি নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে সংস্কারের বিষয়ে আর কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না। বরং তাঁরা দ্রুত জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের দাবি জোরদার করেছেন। এই দাবিতে তাঁরা রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করছেন।
অবশ্য বিএনপি আগে থেকেই বলে এসেছে যে সংস্কার করবে নির্বাচিত সরকার এবং বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কী কী সংস্কার করা হবে, তাদের ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে তা রয়েছে। কিন্তু তাতে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে নতুন রাজনৈতিক দলের আকাঙ্ক্ষা মিটবে বলে মনে হয় না। তাই নতুন দলের উদ্যোক্তা, পৃষ্ঠপোষক এবং জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা দলগুলো নির্বাচনের আগে অন্তত মৌলিক বিষয়ে সংস্কার সম্পন্ন করার কথা বলে যাচ্ছে। ফলে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো ছাড়া দেশের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে সমঝোতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন কার্যত ভেঙে গেছে। ধারণা করা যায়, সামনের দিনগুলোতে তা আরও ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছাবে।
রাজনৈতিক মেরুকরণে নতুন অনুষঙ্গ হয়ে সামনে এসেছে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ। জুলাই গণহত্যা, গুম, খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত নন—এমন আওয়ামী লীগ নেতারা ক্ষমা চাইলে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পেতে পারেন বলে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে এমন প্রস্তাব এসেছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারও তেমন চিন্তাভাবনাই করছে বলে প্রতীয়মান হয়, যখন সরকারের একাধিক উপদেষ্টা বিষয়টি প্রকাশ্যে বলেন। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারাও এ ধরনের ‘রিডিম এবং রিকনসিলিয়েশন’-এ রাজি বলে জানা যায়। তবে বিষয়টিতে বিএনপির ঘোরতর আপত্তি রয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিষয়টির স্পষ্ট বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁরা বিষয়টিকে দেখছেন ছাত্রদের নতুন দল গঠনের ক্ষেত্রে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে। জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য হলো, গণহত্যার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত ও বিচারকাজ আগে সম্পন্ন করা হোক। ক্ষমার চিন্তা তারপর হতে পারে। আগে নয়।
কোনো কোনো ছাত্রনেতা এবং রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল এবং দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণারও দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমা চেয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসন, নিবন্ধন বাতিল কিংবা নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবির বিষয়ে আওয়ামী লীগের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই সুযোগ দেওয়া আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করার একটি প্রয়াস হতে পারে। তাঁরা মনে করেন, শেখ হাসিনা এবং সরকার ও দলের মূল নেতৃত্বের কারও ক্ষমা চেয়ে পুনর্বাসনের সুযোগ নেই। অন্যদের অনেকে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ নিয়ে রাজনীতিতে আসতে পারেন। সেটা কখনোই প্রকৃত ও পূর্ণ ক্ষমতার আওয়ামী লীগ হবে না। কিন্তু তাঁদেরই রাজনীতি করতে দেওয়া হবে। এইভাবে আওয়ামী লীগ হবে বিভক্ত ও হীনবলসম্পন্ন একটি নামসর্বস্ব দল। এটা না করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা রাখার ফল বিপরীত হতে পারে। যেমন হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক স্বার্থে জামায়াতকে কোণঠাসা করে টিকিয়ে রাখা এবং শেষে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে যে ভুল করেছিল, তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, যাতে আওয়ামী লীগও সেই সুযোগ নিতে না পারে।
জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনেও কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ না করার সুপারিশ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থাটির মানবাধিকার কমিশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক জুলিয়া ব্লেকনার জাতীয় দৈনিক সমকালকে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধের দাবি উদ্বেগের। এতে বাংলাদেশিরা হয়তো আরেকটি নির্বাচন পেতে যাচ্ছে, যেখানে তারা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে না।’ নিষিদ্ধের পরিবর্তে কী করা যেতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘সঠিক উপায়ে তদন্ত করে অভিযোগ গঠন করে বিচার করা।’
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তাতে আরও একটি মাত্রা যুক্ত করেছে বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন এবং তার বাইরেও ছাত্ররাজনীতি ও নতুন ছাত্রসংগঠন গঠন নিয়ে বিভেদ, রক্তাক্ত, হানাহানি। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানেরও আগে থেকে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি এবং অনেক ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন দেখা গেছে। অন্য অনেক সংগঠনের মতো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষেই কথা বলেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে একটি জটিল সমীকরণ। ছাত্ররাজনীতি করতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে বাধা দেওয়া হচ্ছে সাধারণ ছাত্র ও বৈষম্যবিরোধীদের পক্ষ থেকেই। আবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগেই গঠিত হচ্ছে নতুন ছাত্রসংগঠন।
এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব যাঁরা দিয়েছেন, তাঁরা তখন নিজেদের সাধারণ ছাত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু তাঁদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো ছাত্রসংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। এখন নতুন রাজনৈতিক দলের এবং ছাত্রসংগঠনের নেতা হিসেবে তাঁদেরই দেখা যাচ্ছে। তাহলে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বা নিষিদ্ধ নিয়ে হানাহানি কেন? নতুন মেরুকরণ থেকে কোনো সুফল পেতে হলে এসব বিষয়ের বৈষম্যহীন ফয়সালা দরকার।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
এমনিতেই ফেব্রুয়ারি এলে রাজপথগুলো আগুনরাঙা হয়ে ওঠে। বাতাসে গনগনে ফুলকি ছড়াতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারি এ দেশের প্রতিটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় ১৯৫২ সালে তার রচিত পথের কথা। এবার, এই ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার সঙ্গে বাড়তি যুক্ত হয়েছে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের উত্তাপ। মানুষ এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে বাংলাদেশ এক রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘিরে সৃষ্ট নানামুখী টানাপোড়েন ওই উত্তাপ ছড়ানোর পাশাপাশি কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিচ্ছে।
নতুন মেরুকরণের প্রধান উপাদান হলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে নতুন একটি রাজনৈতিক দল এখন আত্মপ্রকাশের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। একই সঙ্গে গঠনপ্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন দলের নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে। অপেক্ষাকৃত তরুণদের উদ্যোগ ও সমন্বয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ায় হয়তো এ ধরনের টানাপোড়েন একেবারে অস্বাভাবিক নয়। তবে বিষয়টি যেভাবে প্রকাশ্যে এসেছে এবং আসছে, তাতে স্বাভাবিক মনে করে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
কারণ, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শীর্ষ নেতাদেরও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন। তাতে এ কথা স্পষ্ট যে নতুন দলের উদ্যোক্তা এবং পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে নেতৃত্বের বিষয়ে একাধিক বলয় তৈরি হয়েছে। আত্মপ্রকাশের আগেই এই অবস্থা নেতাদের জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তরুণদের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে একটি উদারপন্থী (তাঁরা অবশ্য মধ্যপন্থী বলেছেন) রাজনৈতিক দল হওয়া সময়ের দাবি। তাঁদের সেই দাবি মেটাতে হবে। নতুন দল অবশ্য আরও দু-একটি হওয়ার কথা শোনা গিয়েছিল। এখনো যে শোনা যাচ্ছে না, তা-ও নয়। তবে সেসব বাতাসেই ভেসে বেড়াচ্ছে। হয়তো এমন দলগুলোর উদ্যোক্তারা বিষয়টি আড়ালে রেখেই শেষ মুহূর্তে প্রকাশিত হতে চান।
এই মেরুকরণ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো বিএনপির প্রতিক্রিয়া। নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ছয় সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের একটি অংশ বিএনপিকে বোধ হয় কিছুটা উদ্বিগ্ন করেছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, কোন রাজনৈতিক দল কতটুকু সংস্কার চায়, তা লিখিতভাবে জানাতে হবে এবং তিনি তা দেশবাসীকে জানানোর জন্য ওয়েবসাইটে দিয়ে দেবেন। এরপর বিএনপি নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে সংস্কারের বিষয়ে আর কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না। বরং তাঁরা দ্রুত জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের দাবি জোরদার করেছেন। এই দাবিতে তাঁরা রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করছেন।
অবশ্য বিএনপি আগে থেকেই বলে এসেছে যে সংস্কার করবে নির্বাচিত সরকার এবং বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কী কী সংস্কার করা হবে, তাদের ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে তা রয়েছে। কিন্তু তাতে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে নতুন রাজনৈতিক দলের আকাঙ্ক্ষা মিটবে বলে মনে হয় না। তাই নতুন দলের উদ্যোক্তা, পৃষ্ঠপোষক এবং জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা দলগুলো নির্বাচনের আগে অন্তত মৌলিক বিষয়ে সংস্কার সম্পন্ন করার কথা বলে যাচ্ছে। ফলে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো ছাড়া দেশের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে সমঝোতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন কার্যত ভেঙে গেছে। ধারণা করা যায়, সামনের দিনগুলোতে তা আরও ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছাবে।
রাজনৈতিক মেরুকরণে নতুন অনুষঙ্গ হয়ে সামনে এসেছে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ। জুলাই গণহত্যা, গুম, খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত নন—এমন আওয়ামী লীগ নেতারা ক্ষমা চাইলে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পেতে পারেন বলে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে এমন প্রস্তাব এসেছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারও তেমন চিন্তাভাবনাই করছে বলে প্রতীয়মান হয়, যখন সরকারের একাধিক উপদেষ্টা বিষয়টি প্রকাশ্যে বলেন। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারাও এ ধরনের ‘রিডিম এবং রিকনসিলিয়েশন’-এ রাজি বলে জানা যায়। তবে বিষয়টিতে বিএনপির ঘোরতর আপত্তি রয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিষয়টির স্পষ্ট বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁরা বিষয়টিকে দেখছেন ছাত্রদের নতুন দল গঠনের ক্ষেত্রে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে। জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য হলো, গণহত্যার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত ও বিচারকাজ আগে সম্পন্ন করা হোক। ক্ষমার চিন্তা তারপর হতে পারে। আগে নয়।
কোনো কোনো ছাত্রনেতা এবং রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল এবং দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণারও দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমা চেয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসন, নিবন্ধন বাতিল কিংবা নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবির বিষয়ে আওয়ামী লীগের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই সুযোগ দেওয়া আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করার একটি প্রয়াস হতে পারে। তাঁরা মনে করেন, শেখ হাসিনা এবং সরকার ও দলের মূল নেতৃত্বের কারও ক্ষমা চেয়ে পুনর্বাসনের সুযোগ নেই। অন্যদের অনেকে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ নিয়ে রাজনীতিতে আসতে পারেন। সেটা কখনোই প্রকৃত ও পূর্ণ ক্ষমতার আওয়ামী লীগ হবে না। কিন্তু তাঁদেরই রাজনীতি করতে দেওয়া হবে। এইভাবে আওয়ামী লীগ হবে বিভক্ত ও হীনবলসম্পন্ন একটি নামসর্বস্ব দল। এটা না করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা রাখার ফল বিপরীত হতে পারে। যেমন হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক স্বার্থে জামায়াতকে কোণঠাসা করে টিকিয়ে রাখা এবং শেষে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে যে ভুল করেছিল, তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, যাতে আওয়ামী লীগও সেই সুযোগ নিতে না পারে।
জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনেও কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ না করার সুপারিশ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থাটির মানবাধিকার কমিশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক জুলিয়া ব্লেকনার জাতীয় দৈনিক সমকালকে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধের দাবি উদ্বেগের। এতে বাংলাদেশিরা হয়তো আরেকটি নির্বাচন পেতে যাচ্ছে, যেখানে তারা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে না।’ নিষিদ্ধের পরিবর্তে কী করা যেতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘সঠিক উপায়ে তদন্ত করে অভিযোগ গঠন করে বিচার করা।’
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তাতে আরও একটি মাত্রা যুক্ত করেছে বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন এবং তার বাইরেও ছাত্ররাজনীতি ও নতুন ছাত্রসংগঠন গঠন নিয়ে বিভেদ, রক্তাক্ত, হানাহানি। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানেরও আগে থেকে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি এবং অনেক ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন দেখা গেছে। অন্য অনেক সংগঠনের মতো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষেই কথা বলেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে একটি জটিল সমীকরণ। ছাত্ররাজনীতি করতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে বাধা দেওয়া হচ্ছে সাধারণ ছাত্র ও বৈষম্যবিরোধীদের পক্ষ থেকেই। আবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগেই গঠিত হচ্ছে নতুন ছাত্রসংগঠন।
এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব যাঁরা দিয়েছেন, তাঁরা তখন নিজেদের সাধারণ ছাত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু তাঁদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো ছাত্রসংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। এখন নতুন রাজনৈতিক দলের এবং ছাত্রসংগঠনের নেতা হিসেবে তাঁদেরই দেখা যাচ্ছে। তাহলে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বা নিষিদ্ধ নিয়ে হানাহানি কেন? নতুন মেরুকরণ থেকে কোনো সুফল পেতে হলে এসব বিষয়ের বৈষম্যহীন ফয়সালা দরকার।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
আর কিছুদিন পরই পয়লা বৈশাখ। সেদিন মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে, না আনন্দ শোভাযাত্রা, তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্কের পর স্থির হলো মঙ্গলেই সবাই নোঙর ফেলবে। আলাপ শুধু এখানে হলে ভালো হতো, দেখা গেল মঙ্গল শোভাযাত্রায় কোন ধরনের মোটিফ ও পুতুল থাকবে...
৩ ঘণ্টা আগেএবার ঈদের আমেজ নানা কারণেই কিছুটা ভিন্ন। এত লম্বা ঈদের ছুটি আগে কখনো হয়েছিল কি? ঈদ সামনে রেখে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর যে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা দেখা যায়, এবার সেটা ছিল না। যাঁরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের কোনো সাফল্য দেখেন না, তাঁরা এই বাজারের নিরুত্তাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারেন।
৩ ঘণ্টা আগেআজ ৪ এপ্রিল দেশবরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সন্জীদা খাতুনের ৯৩তম জন্মদিন। মাত্র কয়েক দিন আগেই গত ২৫ মার্চ তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সন্জীদা খাতুন সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলা আমার পক্ষে ধৃষ্টতার শামিল। তবে আজীবন দেশমাতৃকার মঙ্গল কামনায় ব্রতী এই মহীয়সী নারী...
৩ ঘণ্টা আগেকথা বলি কেন? না, বড় বড় তাত্ত্বিক বা পণ্ডিতি ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। আমি কথা বলি, কারণ কথা না বলে আমার চলে না। এই যাপিত জীবনে আমার বলার নানান বিষয় আছে, আবার জানারও নানান বিষয় আছে। অতএব, কথা আমাকে বলতেই হয়।
১ দিন আগে