Ajker Patrika

সীমাহীন অপেক্ষায় বেলুচ নারীরা

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

‘প্রিয় বাবাজান, তুমি কখন ফিরে আসবে? যখনই আমি খাবার খাই বা পানি পান করি, তোমাকে খুব মনে পড়ে। বাবা, তুমি কোথায়? আমি তোমাকে খুব অনুভব করি। আমি একা। তোমায় ছাড়া আমি ঘুমাতে পারি না। আমি শুধু তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। তোমার মুখ দেখতে চাই।’

একটি পাতলা ম্যাটের ওপর পা মুড়ে বসে কাগজে লেখা এই লাইনগুলো নিজে নিজেই পড়ে ১০ বছর বয়সী মাসুমা। আজকাল ক্লাসের চেয়ে বেশি সময় তার কাটে প্রতিবাদ সমাবেশে। চিঠির সঙ্গে থাকে তার হারিয়ে যাওয়া বাবার ছবি। সেগুলো সে খুব সাবধানে নিজের স্কুলব্যাগে নিরাপদে রাখে। প্রতিবাদে অন্য সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে স্লোগান দেয়। একটা সময় তার ক্লান্ত ছোট্ট শরীর শোকার্ত পরিবারের মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যায়। সবার বাবা কাজ শেষে রাতে বাড়ি ফিরে আসেন। কিন্তু ১০ বছর বয়সী মাসুমা কখনো নিজের চোখে বাবাকে ফিরতে দেখেনি। কারণ, তার ১০ মাস বয়সে বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

বেলুচিস্তানের আন্দোলনকারীরা বলেছেন, গত দুই দশকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী হাজার হাজার বেলুচকে গুম করেছে। তাঁদের অনেকে অবৈধভাবে আটক হয়েছেন, অথবা অপহৃত, নির্যাতিত এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে নিহত হয়েছেন। এদিকে পাকিস্তান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির সরকার দাবি করেছে, গায়েব হওয়া অনেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপে যোগ দিয়েছেন কিংবা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। কেউ কেউ বছর ঘুরলে ফিরে আসেন। অনেকে ফিরে আসেন না। আর অনেককে পাওয়া যায় বেলুচিস্তানে অজ্ঞাত সমাধিক্ষেত্রে। তাঁদের দেহ এতটাই বিকৃত থাকে যে শনাক্ত করা যায় না। এভাবে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছেন বেলুচ পুরুষেরা। থেকে যাচ্ছেন সেই নারীরা, যাঁরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অপেক্ষার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের কেউ তরুণী, কেউ বৃদ্ধা।

তেমনি একজন ৭০ বয়সী জান্নাত বিবি। তিনি এখন ছোট ছোট দোকানে বিস্কুট ও দুধের কার্টন বিক্রি করে দিন যাপন করেন। জান্নাত বিবি দাবি করেন, ২০১২ সালে একটি হোটেলে নাশতা করার সময় তুলে নেওয়া হয়েছিল তাঁর ছেলেকে। সেই ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে জান্নাত বিবি চলে গিয়েছিলেন ইসলামাবাদ পর্যন্ত। ছেলের খোঁজে প্রায়ই তিনি প্রতিবাদে অংশ নিতে যান বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু বাসভাড়া পরিশোধ করতে পারেন না।

এমন হাজারো ঘটনা আছে বেলুচিস্তানে। সেখানে মেয়ের কান্না থামে না বাবার পথ চেয়ে, নববধূর চোখের উজ্জ্বলতা হারায় শোকে, বৃদ্ধ মায়ের বুকের হাহাকার শেষ হয় না। সেই নারীরাই প্রতিবাদে অংশ নেন। তখন তাঁদের মুখে দুঃখের রেখা ফুটে ওঠে। তাঁদের একমাত্র সম্বল হাতে থাকা মলিন ছবিগুলো। সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁরা তাঁদের আপ্যায়ন করেন ভাঙা কাপে টলমল করতে থাকা লিকার কিংবা সুলেমানি চা দিয়ে। কথা বলার সময় তাঁদের কণ্ঠস্বর ভাঙা কাপের মতোই রূপ নেয়। লিকার চায়ের মতো টলমল করতে থাকে তাঁদের দুঃখে দগ্ধ হওয়া দিনের বর্ণনা। কিন্তু সেই চায়ের ধোঁয়ার মতো তাঁদের জীবনের কষ্টগুলো উড়ে যায় না।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সাইরা বেলুচের ভাই মুহাম্মদ আসিফ বেলুচ যেদিন নিখোঁজ হন, সেদিন সাইরার কোনো এক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। পরীক্ষায় ভালো ফলের খবর প্রথম ভাইকে জানানোর ইচ্ছে ছিল তাঁর। ভাই বলেছিলেন, তিনি সাইরাকে কোয়েটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন। সাইরা আজ বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটায় নিখোঁজ ভাইয়ের সন্ধানে ঘুরছেন এক মর্গ থেকে অন্য মর্গে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি এমন একটি মৃতদেহ দেখেছিলেন, যার চোখ ছিল না, দাঁতগুলো তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং বুকের ওপর ছিল পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন। তাঁর স্বস্তির জায়গা এটাই ছিল যে সেই লাশ তাঁর ভাইয়ের ছিল না। এরপর কেটে গেছে সাত বছর। সাইরা এখনো তাঁর ভাইকে খুঁজে ফিরছেন।

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেলুচিস্তান যেন এক অন্য পৃথিবী। যেন একাকী সড়ক চলে গেছে নির্জন ভূমির দিকে। বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের আক্রমণ তীব্র করেছে। তারা বোমা হামলা, হত্যা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য মাইন পুঁতে রাখার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এই মাসের শুরুতে তারা বোলান পাসে একটি ট্রেন ছিনতাই করার মাধ্যমে শত শত যাত্রীকে বন্দী করে। যাদের মুক্তির বিনিময়ে তারা বেলুচিস্তানে ‘গায়েব’ হওয়া মানুষের মুক্তির দাবি জানায়। ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা সে ঘটনায়, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের মতে, ৩৩ জন বিএলএ সশস্ত্র যোদ্ধা, ২১ জন বেসামরিক বন্দী এবং ৪ জন সামরিক কর্মী নিহত হয়েছেন। তবে এর বিপরীতে অনেকে দাবি করেছেন, সেখানে অনেক যাত্রীর মৃত্যুর হিসাব করা হয়নি।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সদস্য বা সমর্থক হিসেবে সন্দেহ করে অনেক মানুষকে গুম করা হয় বেলুচিস্তানে। গুমের শিকার সেই সব মানুষের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক একেবারে সাধারণ নাগরিক, যাঁদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। এদিকে বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র—সবাই আওড়াচ্ছেন দায়সারা বক্তব্য। কেউ বলছেন, সমস্যার সমাধান হয়েছে; কেউ বলছেন, গুম হওয়ার ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটছে না। কিন্তু সেসব তথ্যের নির্ভরযোগ্য কোনো উৎস নেই। কোন পক্ষের দাবি সঠিক, তা যাচাই করারও কোনো উপায় নেই।

আসছে ঈদ। সীমাহীন অপেক্ষায় থাকা নারীদের আনন্দ কি ফিরবে?

সূত্র: বিবিসি

বিষয়:

নিহতনারী
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত