Ajker Patrika

আমি বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন: অমর্ত্য সেন

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৫, ১০: ১৬
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। ছবি: সংগৃহীত
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনি বলেছেন, চলমান সংকট সমাধানে তাঁর বন্ধু ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনে নিজ বাড়িতে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের রাজনীতি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে কথা বলেছেন অমর্ত্য সেন। আজ রোববার এই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে পিটিআই।

অমর্ত্য সেন বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং তিনি উদ্বিগ্ন যে দেশটি কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতসহ বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং দেশটির উচিত ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রাখা।

অমর্ত্য সেন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। কারণ, আমার মধ্যে একটি শক্তিশালী বাঙালি পরিচয়ের অনুভূতি আছে। আমি ঢাকায় অনেক সময় কাটিয়েছি এবং সেখানে আমার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল। এ ছাড়া মানিকগঞ্জে আমাদের পৈতৃক বাড়ি ছিল। আর মাতৃকুলের কারণে বিক্রমপুরের সোনারংয়ে নিয়মিত যেতাম। এই জায়গাগুলোর প্রতি আমার গভীর ব্যক্তিগত সংযোগ আছে। অনেকের মতো আমিও উদ্বিগ্ন, বাংলাদেশ কীভাবে এই সংকট অতিক্রম করবে।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশটির উন্নয়ন প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেন বলেন, একসময় বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল; পাশাপাশি দেশটিতে জন্মহার কমেছে এবং গড় আয়ু ভারতের চেয়ে বেশি হয়েছে।

অমর্ত্য সেন বলেন, ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, বিশেষত নারীর ক্ষমতায়নে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। একজন গবেষক হিসেবে আমি লক্ষ করেছি, এই ক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা—বিশেষ করে ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংকের অবদান অনেক বেশি।’

এ ছাড়া অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো তুলনামূলকভাবে স্বাধীন, সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়েও অনেক গণমাধ্যম কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে।’

অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ভূমিকারও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘অনেক দেশের মতো বাংলাদেশে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়নি, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা জানিয়ে অমর্ত্য সেন বলেন, ‘এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে অতীতের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশকে তার ঐতিহ্য অনুযায়ী দলীয় বিভক্তির বাইরে এসে সমাধান খুঁজতে হবে। একটি বড় পরিসরে চিন্তা করতে হবে। আশা করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বহুত্ববাদে বাংলাদেশের অঙ্গীকার টিকে থাকবে। ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলো আরও স্বচ্ছ হবে বলে আশা করি। পরিবর্তনের জায়গা এখনো আছে। আমি বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তবে আশাহীন নই।’

মুহাম্মদ ইউনূসকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মূল্যায়ন করতে গিয়ে অমর্ত্য সেন বলেন, ‘ইউনূস আমার পুরোনো বন্ধু। আমি জানি, তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও বহু দিক থেকে অসাধারণ একজন মানুষ। তিনি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন।’

অমর্ত্য সেন আরও বলেন, ‘একজন নেতা হিসেবে ইউনূসকে বিভিন্ন পক্ষের কথা বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইসলামি দল রয়েছে, আবার হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর দাবিও আছে। আমি তার সক্ষমতা নিয়ে আশাবাদী।’

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং মন্দির ভাঙচুরের ঘটনায় অমর্ত্য সেন তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা শুধু সরকারের নয়, জনগণেরও দায়িত্ব।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গর্বিত ছিল এবং জামায়াতের মতো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। দুঃখজনকভাবে, ভারতের কিছু এলাকায় মসজিদেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ বা ভারত—যেখানেই হোক, এসব সহিংসতা বন্ধ হওয়া দরকার।’

সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিয়ে সতর্ক করে অমর্ত্য সেন বলেন, ‘বেছে বেছে কিছু ঘটনা প্রচার করে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়া সবচেয়ে সহজ কাজ। ১৯৪০-এর দশকের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময়ও এভাবে উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছিল, যার ফলে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটে। অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত এবং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এগিয়ে যাওয়া উচিত।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত