Ajker Patrika

ড. ইউনূসের চীন সফর: বাংলাদেশের আশা, ভারতের উদ্বেগ

ড. ইউনূসের চীন সফর: বাংলাদেশের আশা, ভারতের উদ্বেগ

বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে একটি আলোচিত বিষয়। সম্প্রতি চীন এই প্রকল্প নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ ড. খলিলুর রহমান। প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো সমাধান আসেনি। ফলে বাংলাদেশ বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। চীনের সঙ্গে এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা সেই বিকল্প পথেরই অংশ।

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাতা দেশ এবং পানি ব্যবস্থাপনায় তাদের অভিজ্ঞতা ব্যাপক। ইয়াংজে নদীসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফল হয়েছে। বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। চীন যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তাহলে এটি হবে বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শুধু অর্থায়ন নয়, চীন এই প্রকল্পে কারিগরি সহায়তাও দিতে পারে, যা বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত করবে। নদীর নাব্যতা রক্ষা, পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিক্ষেত্রে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে চীনের দক্ষতা রয়েছে, যা বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে।

চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে তিস্তা নদীর ড্রেজিং, নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব। চীনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের কৃষি, জ্বালানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিকও বিবেচনা করা জরুরি। চীনের সঙ্গে অর্থায়ন সংক্রান্ত চুক্তি করার সময় বাংলাদেশকে অবশ্যই ঋণের শর্তাবলী বিশ্লেষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা বৃদ্ধি না পায়। অনেক দেশ চীনের ঋণ গ্রহণের ফলে আর্থিক সংকটে পড়েছে, তাই বাংলাদেশকে এই বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে।

চীন পৃথিবীর বৃহত্তম পানি প্রকল্প ‘থ্রি গর্জেস ড্যাম’ সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে, যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে যুগান্তকারী। তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবও ছিল। যেকোনো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। চীন আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে ঋণের ফাঁদে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। বাংলাদেশকেও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঋণের শর্ত, প্রকল্প পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বোঝা সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।

তিস্তা নদীর পানি নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও এখনো কার্যকর কোনো সমাধান আসেনি। ভারতের উত্তরবঙ্গের জন্য তিস্তা গুরুত্বপূর্ণ, তাই ভারত এই প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে সংবেদনশীল হতে পারে। চীন ও ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতের উদ্বেগ থাকলেও বাংলাদেশ যদি একটি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে এগোয়, তাহলে এটি উভয় দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে এই প্রকল্প নিয়ে এগোতে হবে, যাতে কোনো আন্তর্জাতিক চাপ বা রাজনৈতিক জটিলতার মুখে পড়তে না হয়।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঋণ শর্ত ও প্রকল্প ব্যয় বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন। চীন ও ভারতের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি পথ বের করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যে না পড়ে। পরিবেশ, সমাজ ও কৃষির ওপর প্রভাব পর্যালোচনা করে প্রকল্প পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা সৃষ্টি না হয়। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে, তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ, যা চীনের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এ নিয়ে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ সঠিকভাবে সামলানো যায়। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের মাধ্যমে তিস্তা প্রকল্পকে একটি টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিণত করা সম্ভব।

দুই

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সূত্র ধরে সাম্প্রতিক কালে একের পর এক প্রসঙ্গ সামনে আসছে, যা কূটনৈতিক ভারসাম্যের নতুন পরীক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত আলোচনা যখন নতুন মাত্রা পাচ্ছে, তখন চীন সফরে গিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য ভারতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তার মন্তব্য যে শুধু ভারতের রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছে তা নয়, বরং এটি দুই দেশের কৌশলগত অবস্থানকেও নতুন আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় ড. ইউনূস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য, যা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত, সেগুলোর ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘ভারতের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই সাতটি রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ল্যান্ডলকড (স্থলবেষ্টিত)। সমুদ্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। আমরাই এই অঞ্চলের জন্য সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক।’

এই বক্তব্য ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যাল থেকে শুরু করে ভারতের সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ প্রফুল্ল বকশি এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্বশর্মাসহ অনেকেই এই বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের এমন অবস্থান গ্রহণ ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। বিশেষ করে, ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ প্রফুল্ল বকশি এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি বলেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশ তৈরি করেছি। বাংলাদেশ তৈরির সময় আমরা কোনো মানচিত্রগত সুবিধা নিইনি। কিন্তু এখন বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তান এই করিডরকে কাজে লাগিয়ে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।’

তাঁর এই মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের অতীত এবং ভবিষ্যৎ পরিপ্রেক্ষিতের একটি জটিল বাস্তবতা তুলে ধরে।

এদিকে, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার মন্তব্য আপত্তিকর এবং তীব্রভাবে নিন্দনীয়।’ তিনি চিকেনস নেক করিডরের বিকল্প পথ তৈরি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং বলেছেন, ‘এই করিডোরের নিচে ও চারপাশে আরও শক্তিশালী রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।’

একইসঙ্গে, ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও এই বিষয়টি নিয়ে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এই বিতর্ক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর দিককে সামনে নিয়ে এসেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ হয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সংযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, এবং এর অংশ হিসেবে ট্রানজিট চুক্তির মতো ব্যবস্থাও কার্যকর হয়েছে। তবে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে কীভাবে কাজে লাগাতে চায় এবং ভারতের প্রতিক্রিয়া কী হবে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সুতরাং, বাংলাদেশকে তার পররাষ্ট্রনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলী হতে হবে, যাতে একপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে অন্যপক্ষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত