Ajker Patrika

পরকীয়া ও অস্ত্রাঘাত: বড় অপরাধ কোনটি

স্বপ্না রেজা
পরকীয়া ও অস্ত্রাঘাত: বড় অপরাধ কোনটি

সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরায় সংঘটিত একটি ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও মূলধারার মিডিয়া বেশ সরব হয়েছে। তবে সময়ের ব্যবধানে ঘটনাটি নিয়ে দুই ধরনের গল্প প্রচার হয়েছে এবং সেটা বেশ যৌক্তিকতার দোহাইতে, যা সচরাচর হয়ে থাকে। অন্য আর দশটি ঘটনার মতো এখানেও যথেষ্ট ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও যুক্তি টেনে দাঁড় করানো হয়েছে, কল্পনার ফানুস ওড়ানো হয়েছে। এটা তো বলা বাহুল্য যে এ দেশের মানুষের অধিকাংশই কারণে-অকারণে গল্প করতে ভালোবাসে। এককথায় বলা যায় গল্পবাজ।

গল্পের সঙ্গে পরিমাণমতো থাকে গুজব। গুজব তৈরিতে, ছড়াতেও যথেষ্ট পারদর্শিতা রয়েছে এখানকার মানুষের। আর যদি এসব গল্পগুজবের ভেতর নারীর অস্তিত্ব পাওয়া যায় তাহলে তো আর কথা নেই, গল্পগুজবের শাখা-প্রশাখাও তরতর করে বেড়ে যায়। এমন গল্পবাজ আচরণ বা ক্রিয়াকর্মে বলা যায় যে উপযুক্ত শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের বেশ ঘাটতি রয়েছে সমাজ ও সামাজিক জীবনে, তাই গল্পগুজবের এমন বেপরোয়া অবতারণা। ফলে সমাজে দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব ইতিবাচকভাবে গড়ে উঠছে না। ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব চিন্তা, চেতনা, জ্ঞানে ও শিক্ষায় সবকিছুকে প্রত্যক্ষ করেন এবং সেই অনুপাতে রায় বা মতামত দিয়ে বসেন। ফলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব সুস্থ সমাজ-উপযোগী ও সমাজের কল্যাণে যায় কি না, এসব ভেবে দেখার মানুষের বড় অভাব থেকে যায়। যাহোক, ঘটনায় আসা যাক।

প্রথমে ঘটনাটি নিয়ে যে গল্প প্রচার হয়েছে সেটা হলো, বেপরোয়াভাবে হোন্ডা চালিয়ে একটি রিকশাকে ধাক্কা দেওয়ায় তার প্রতিবাদ করায় এক দম্পতিকে রামদা নিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করেছে দুই যুবক—এমন তথ্যের সঙ্গে আঘাতের ছবিও ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন নারী একজন পুরুষকে রক্ষা করতে তৎপর রয়েছেন। নারী হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে যেন তিনি পুরুষের প্রাণভিক্ষা চাইছেন। আর পুরুষটি নারীর পেছনে আশ্রয় নিয়েছেন।

সঙ্গে সঙ্গে আবেগময় কথাবার্তা বলা শুরু হলো সোশ্যাল ও মূলধারার মিডিয়ায়। প্রথমে কোথাও কোথাও বলা হলো, পতিপ্রিয় একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীকে রক্ষা করছেন। কোথাও কোথাও বলা হলো, একজন সাহসী নারী তাঁর স্বামীকে রক্ষা করতে নিজের জীবনকে এগিয়ে দিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনিতেই বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সাধারণ মানুষ বেশ উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত। পথেঘাটে, বাসায় কোথাও মানুষ নিরাপদ নয়, নিরাপদবোধ করতে পারছে না। ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, হত্যার মতো ঘটনা নিত্যদিনকার। ঢাকার বেশ কটি অঞ্চল আবার এসব ঘটনার জন্য শীর্ষ তালিকায় স্থান পেয়েছে, যার মধ্যে উত্তরা উল্লেখযোগ্য। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় উত্তরায় দম্পতিকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করার বিষয়টি জনমনে বেশ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। একদিকে অন্যায়ের প্রতিবাদ, অন্যদিকে একজন স্ত্রীর সাহসী ভূমিকা—দুটি বিষয়ই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সহানুভূতি জাগিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া ও মূলধারার মিডিয়ায় বিষয়টি ভাইরাল হলে খুব দ্রুতই আসামিদের ধরা সম্ভব হয় বলে অনেকেই মনে করে। যাহোক, ঠিক এর কয়েক দিন পর এ-সংক্রান্ত দ্বিতীয় গল্প ভাইরাল হয়। বিপরীত বলা যায়। একই ভিডিও ও ছবি পোস্ট করে ভাইরাল হয় যে চাপাতি দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত নারী ও পুরুষ আসলে প্রকৃত স্বামী-স্ত্রী নন। তাঁরা প্রেমিক ও প্রেমিকা। আরও গল্প ছড়িয়ে যায় যে পুরুষটি বিবাহিত এবং ওই নারীর সঙ্গে তাঁর পরকীয়ার সম্পর্ক রয়েছে। পুরুষটির প্রকৃত স্ত্রী এই সংবাদ প্রেসকে জানিয়েছেন। ব্যস, শুরু হয়ে যায় ইতিমধ্যে তাঁদের প্রতি যে ‘বাহবা’ সম্বোধন দেওয়া হয়েছিল, তা মুছে অন্য সম্বোধন দেওয়ার হীন প্রতিযোগিতা। কে কতটা পারে রস মিশিয়ে গল্পের কাটতি বাড়াতে, তার দৌড় শুরু হয়। এই দৌড়ের লক্ষ্যবস্তু যেন ঘুরেফিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল সেই নারী। হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকা নারী আর তাঁর পেছনে পুরুষ দাঁড়িয়ে, এমন ছবির ক্যাপশন, বর্ণনা রাতারাতি বদলাতে শুরু হলো। নারীর সাহসের জায়গায় স্থান পেতে লাগল নাক সিটকানো নেতিবাচক শব্দ, যে যা পারল তেমন শব্দ যুক্ত করল। পুরো ঘটনাটি দ্বিতীয় দফায় এমনভাবে ভাইরাল হতে শুরু হলো যে, মনে হতে পারে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাঁদের চাপাতি বা রামদা দিয়ে কোপানো অন্যায় নয়, অন্যায় কাজটি হলো পরকীয়া কিংবা তাঁরা প্রকৃত দম্পতি যে নন, সেটা। কিংবা পরকীয়ার চেয়ে চাপাতি বা রামদা দিয়ে কোপানো উত্তম। যখনই জানা গেল যে তাঁরা প্রকৃত দম্পতি নন, তখনই শুরু হলো নারীবিদ্বেষী আলাপচারিতা। যেটা আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত বলা যায়। এটা বলা অনস্বীকার্য যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীকে সব অন্যায়ে একমাত্র দোষী সাব্যস্ত করায় কোনো কৃপণতা নেই। বরং সেটা প্রকাশে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ দেখা যায় বিভিন্ন মাধ্যমে। যে যা পারে তাই নিয়ে নারীর চরিত্রে কালিমা লেপে দেয় এবং সেটাকেই প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া হয়। এভাবে অনেক সময় অনেক ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। আসল ঘটনা, প্রকৃত অপরাধ ও অপরাধী ছাড় পেয়ে যায়।

প্রকাশ্যে চাপাতি বা রামদা দিয়ে কোপানো কি কখনো আইনসম্মত আচরণ হতে পারে? নিশ্চয়ই না। এটা একটা কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ, আইন অমান্য তো বটেই, যা সমাজকে অনিরাপদ করে তোলে, রক্তাক্ত করে। আবার পরকীয়া নিয়ে একেক জনের একেক রকম মতবাদ বা অনুভূতি থাকতে পারে। থাকে দর্শনও। পরকীয়াকে কেউ কেউ সামাজিক সম্পর্ককে ভেঙে দেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করে। আবার কেউবা মনে করে, এটা ব্যক্তির স্বাধীনতা। তবে যারা পরকীয়ায় লিপ্ত হয় আর যারা লিপ্ত হয় না, এই দুয়ের মতবাদ বা দর্শনের মধ্যে থাকে আকাশ-পাতাল ফারাক। পরকীয়া সম্পর্কে নারী ও পুরুষ উভয় দায়ী হলেও সমাজ নারীকেই দোষী সাব্যস্ত করে থাকে। পুরুষের বহুগামিতা মেনে নিলেও নারীর ক্ষেত্রে সেটা হয় কঠিন আপত্তিকর ও অপরাধ। আবার সমাজে যারা পরকীয়ার বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের ভেতরও এহেন আচরণ দেখা যায়। গবেষণা হলে দেখা যেত এমন সম্পর্কের ভয়াবহতা কতটা। যাহোক, ব্যক্তির ভেতরকার স্ববিরোধিতা একটা সময়ে পরিবার ও সমাজকে বিভাজিত করে দেয়, আদর্শচ্যুত হতে সহায়তা করে।

পরিশেষে বলব, প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা সমাজের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির এক ভয়াবহ পরিণতি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার এক চরম ব্যর্থতা। আর এমনটি হয় যখন রাষ্ট্র জনগণের নিরাপত্তা বিধানের চেয়ে বেশি রকম অন্যত্র মনোযোগী হয়। উত্তরার চাপাতি দিয়ে আঘাতের ঘটনাটি অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি, অব্যবস্থাপনা ও মূল্যবোধহীন সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, যথাযথ আইন প্রয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত