Ajker Patrika

বরিশাল নগরী

পাইপলাইনে ঢুকবে বালু, পুকুর-জলাশয়ের সর্বনাশ

  • পরিবেশের সর্বনাশ হওয়ার শঙ্কা পরিবেশবাদীদের।
  • ২০১৩ সালে তৎকালীন মেয়র পাইপলাইনে বালু সরবরাহ বন্ধ করেন।
  • পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি দেখা হবে: বিসিসি।
  • পুকুর, জলাশয় কোনোভাবেই ভরাট করতে দেওয়া হবে না: পরিবেশ অধিদপ্তর।
খান রফিক, বরিশাল 
পাইপলাইনে ঢুকবে বালু, পুকুর-জলাশয়ের সর্বনাশ

দীর্ঘ এক যুগ পর বরিশাল নগরীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে বালু সরবরাহের অনুমোদন দিতে যাচ্ছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। তবে এ ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না সরকারি নির্দেশনা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই ২০ লাখ টাকা করে জামানত নিয়ে দেওয়া হচ্ছে বালু সরবরাহের ইজারা। ইতিমধ্যে ২২ জন ইজারাদার জামানতের টাকা দিয়েছেন।

এদিকে হঠাৎ বরিশাল নগরে বালু প্রবেশের অবাধ স্বাধীনতা দেওয়ায় পরিবেশের সর্বনাশের আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা। তাঁদের মতে, এটা কার্যকর হলে পুকুর, জলাশয়, কৃষিজমি ভরে শেষ করে দেবে অসাধু চক্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সীতারামের দিঘিটি ভরাটের চেষ্টা চলছে কয়েক বছর ধরে। স্থানীয় আলী চেয়ারম্যান রাতের আঁধারে একটু একটু করে ভরাটের চেষ্টা করলে কয়েকবারই বাধা দিয়েছে সিটি করপোরেশন। ড্রেজার দিয়ে পাইপলাইনে ভরাট করতে পারলে দিঘিটি বহু আগেই ভরাট হয়ে যেত। কীর্তনখোলা নদীতীরের ত্রিশ গোডাউন পুকুরটিও অর্ধেক ভরাটের পর বাধার মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়। এক যুগ ধরে এভাবে নগরীতে বালু দিয়ে ভরাট কার্যক্রমে অনেকটা চাপের মুখে ছিল বালুখেকোরা। কিন্তু সম্প্রতি সিটি করপোরেশন নতুন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে নগরীতে বালু সরবরাহের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইজারায় অংশ নেওয়া ড্রেজার ব্যবসায়ী মো. কিরণ বলেন, তাঁরা আবেদন করে ২০ লাখ টাকা জামানত দিয়েছেন। এর মাধ্যমেই বালু সরবরাহ করতে পারবেন। বিভিন্ন নদীর ২৬টি পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন করতে পারবেন। এর মধ্যে কীর্তনখোলাও রয়েছে।

বিসিসির উচ্ছেদ শাখার প্রধান এবং পাইপলাইনে বালু সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস বলেন, ‘তাঁরা আনলোড ড্রেজারের মাধ্যমে নগরীতে পাইপলাইনে বালু সরবরাহের জন্য আবেদন নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত ২২টি আবেদন পড়েছে। এ জন্য ২০ লাখ টাকা করে জামানত গ্রহণ করেছেন। টেন্ডার কার্যক্রমে নয়, আবেদন জমা নেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, প্রতি ঘনফুট বালুর বিপরীতে ১ টাকা করে দিতে হবে বিসিসিকে।

পাইপলাইনে বালু প্রবেশ বন্ধ থাকা প্রসঙ্গে স্বপন বলেন, ‘সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরন ২০১০ সালে বালু প্রবেশের অনুমোদন দিয়েছিলেন। এরপর আর বালু ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পুকুর, জলাশয় ভরাট না হয় এবং পরিবেশ আইন মেনে বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে নগরীতে পাইপলাইনে বালু সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।’

জানা গেছে, ২০১৩ সালে তৎকালীন মেয়র আহসান হাবিব কামাল পাইপলাইনে বালু সরবরাহ বন্ধ করেন। এরপর সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ এবং সবশেষ আবুল খায়ের আবদুল্লাহর সময়ও বন্ধ ছিল।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশালের সমন্বয়ক রফিকুল আলম বলেন, ‘আমরা চার-পাঁচ বছর আগে এক জরিপে নগরীতে ২০০ পুকুরের অস্তিত্ব পেয়েছি। কিন্তু এখন গরমিল দেখছি। বেলা সম্প্রতি নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে কতটি পুকুর, জলাশয় আছে, তা চিহ্নিত করার জন্য কমিটি করেছিল। তাতে নগরীতে এ পর্যন্ত ১০০ থেকে ১২৫টি পুকুর খুঁজে পাওয়া গেছে। এই কয়েক বছরে সিটি করপোরেশনের বিধিনিষেধ সত্ত্বেও অনেক পুকুর ভরাট হয়েছে। এমনকি সরকারি পুকুরও ভরাট হয়েছে। এ অবস্থায় ড্রেজারের মাধ্যমে পাইপলাইনে বালু প্রবেশের অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হলে পরিবেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে।’

রফিকুল বলেন, ‘ইজারাদাররা একটা স্পট ভরাটের অনুমতি নিয়ে ভরবে ২০টি। রাতের আঁধারে পুকুর, জলাশয়, কৃষিজমি শেষ করে দেবে। এমনটা হলে পরিবেশবাদীরা সামাজিক মুভমেন্ট এবং আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।’

বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী বলেন, ‘তাঁরা নগরীতে বালু প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছেন। এ জন্য কোনো টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি। তবে ২০ লাখ টাকার পে-অর্ডার নেওয়া হচ্ছে। শর্ত সাপেক্ষে বালু ঢোকার অনুমতি দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে পরিবেশের যাতে ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি দেখা হবে।’

পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, ‘পাইপলাইনে বালু সরবরাহ করা হলে তাতে ডোবা, নালা কিংবা কারও বাড়ির নিচু জমি ভরাট করতে পারবে। কিন্তু এই সুযোগে পুকুর কিংবা জলাশয় কোনোভাবেই ভরাট করতে দেওয়া হবে না। আমরা ধরতে পারলে জরিমানা করব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত