Ajker Patrika

আগুন নেভানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

রাশেদ নিজাম, ঢাকা
আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৩, ১১: ২৬
আগুন নেভানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

বঙ্গবাজারের ঠিক উল্টো দিকেই ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সদর দপ্তর। তারপরও আগুন নেভাতে সময় লেগেছে ছয় ঘণ্টার বেশি। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই কেন নিয়ন্ত্রণে আনা গেল না, প্রশ্ন উঠেছে এখন। সেই সঙ্গে পানির সংকট, আশপাশের ভবনগুলোয় অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সক্ষমতার প্রশ্নটিও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে আরেকবার।

আগুন নেভানোর কাজ ফায়ার সার্ভিসের। ১৪ হাজার ৪৪৩ জনবল নিয়ে সারা দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংস্থাটি। তাদের স্টেশনের সংখ্যা ৫০০ ছুঁতে ৭টি বাকি। পানিবাহী গাড়ি আছে ৬১৭টি। টোয়িং ভেহিক্যালের (পাম্প টানা গাড়ি) সংখ্যা ১ হাজার ৩২২টি। ফায়ার পাম্প রয়েছে ১ হাজার ৩৭০টি। ফোম কেমিক্যাল হ্যাজমেট ও ব্রিদিং টেন্ডার ড্রোনের সংখ্যা ৩৫টি। উঁচু মই আছে ২৪টি এবং অ্যাম্বুলেন্স ১৯২টি।

প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস আগে গত অক্টোবরে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু টিটিএল (টার্ন টেবল লেডার) গাড়ির ঘোষণা দেয় ফায়ার সার্ভিস। এই গাড়ি দিয়ে ২৪ তলা পর্যন্ত আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজ করা যাবে—এমনটাই বলা হয়েছিল তখন। তবে এত উঁচুতে না গিয়ে সদর দপ্তরের উল্টো দিকেই রাজধানীর বঙ্গবাজারে লাগা আগুনই জানান দিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা আর কর্তাব্যক্তিদের ভাবনার ফারাক।

শুধু ফায়ার সার্ভিস নয়, পুরো ঢাকা শহর অগ্নি দুর্ঘটনা মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্ন আরও বড় করে দেখা দিয়েছে বঙ্গবাজারের এই ঘটনায়। আগুন যেখানেই লাগুক না কেন, মানুষের ভিড় ঠেলে, পানির উৎস বের করে তা নেভানো একা ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংস্থাটির সাবেক ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ খান।

ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ খান বলেন, সাধারণ আগুনে পানি ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কেমিক্যাল কিংবা রাসায়নিক ঘটনায় ফোমের ব্যবহার করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে আগুনটাকে আটকে রাখার পদ্ধতিটা ভবনের কাছেই থাকতে হবে। কিন্তু ঢাকার ৯৯ শতাংশ বাড়িতে ওয়াটার রিজার্ভার নেই, নেই হাইড্রেন্ট। যত দিন মানুষ ভবন বানানোর আগে আগুন কিংবা দুর্ঘটনা নিয়ে চিন্তা না করবে, তত দিন আলোচনার করে কোনো ফল আসবে না।

বঙ্গবাজারের দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে আলী আহমেদ খান বলেন, পাশেই পুলিশ সদর দপ্তর ছিল। সেখানে অগ্নি নির্বাপণের ভালো ব্যবস্থা থাকলে তারা সাহায্য করতে পারত। প্রথম ১০ থেকে ১৫ মিনিট যদি আটকানো যেত, এত ছড়াত না।

সাধারণ অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে প্রচুর পানির দরকার পড়ে। এ জন্য আশপাশে পানির উৎস থাকাটা জরুরি। কিন্তু বঙ্গবাজারে পানি না থাকায় আগুন নেভাতে অনেক দূরের হাতিরঝিল থেকে বড় বালতি ভরে পানি নিতে দেখা গেছে হেলিকপ্টারকে। পানি নিতে হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর থেকে।

ঢাকাসহ দেশের ভবনগুলোর কত শতাংশ নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা রেখেছে এমন কোনো হিসাব বা পরিসংখ্যান আছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মইন উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের কাছে এ রকম কোনো পরিসংখ্যান নেই। আমরা কোনো জরিপও করিনি।’

তবে সংস্থাটির গণমাধ্যম শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, হাতে গোনা দু-একটি শপিং কমপ্লেক্সে অত্যাধুনিক এবং নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা আছে। তাদের নিজস্ব ফায়ার ফাইটারও আছে। পাঁচ তারকা মানের হোটেল ও পূর্ণাঙ্গ গার্মেন্টসগুলোতে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া বর্তমানে রিয়েল স্টেট কোম্পানিগুলো যেসব বহুতল ভবন করেছে, সেগুলোতেও ভালো অগ্নিনির্বাপকব্যবস্থা আছে। এটা যদিও সংখ্যায় খুবই নগণ্য, তারপরও হচ্ছে।

আগুন লাগলেই পানির সংকট, ওয়াটার রিজার্ভার নেই, হাইড্রেন্ট নেই এমন নানা কথা আসে। তাহলে এত দিন এগুলো নিয়ে যাদের কাজ করার কথা, তারা করেনি কেন? এই প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. সরওয়ার জাহান।

বুয়েটের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের সাবেক প্রধান সরওয়ার জানান বলেন, আগুন যেন না লাগে এবং লাগলেও যেন দ্রুত নেভানো যায়, এমন করে কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি নগরায়ণে। অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ আর সম্পদ যে ক্ষতিই হোক না কেন, দায় যাবে তদারক সংস্থা আর প্রশাসনের ওপরই। যত দিন তারা সচেতন না হবে, মানুষের সচেতনতাও বাড়বে না। এতই সঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে ফায়ার সার্ভিসকেও।

পানির সংকট এবং অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসকে আমরা ঢেলে সাজাচ্ছি। পানির সরবরাহ না থাকলে ফায়ার সার্ভিস অসহায় হয়ে পড়ে। পানির ব্যবস্থা থাকার জন্য সিটি করপোরেশন ও রাজউক ব্যবস্থা নেবে।’

অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা নেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কাছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এ ধরনের তালিকা আমরা তৈরি করি না। এটা করার দায়িত্ব রাজউকের। রাজউক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করে দিলে সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিই।’

 ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছেও অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা নেই বলে জানিয়েছেন করপোরেশনের তথ্য কর্মকর্তা পিয়াল হাসান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কাজ করে, তাদের ডেডিকেটেড টিম রয়েছে।

তবে রাজউক সূত্রে জানা যায়, তাদের কাছেও ভবন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকার কোনো আলাদা জরিপ নেই। মাঝে মাঝে এলাকা ধরে কিছু কাজ হয়। তাও ধারাবাহিক নয়। তবে ২০০৬ সালে রাজউক এলাকায় মোট স্থাপনার সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৯৬ হাজার ৪১২টি। এক দশকের ব্যবধানে স্থাপনার সংখ্যা ২১ লাখ ৪৭ হাজার ১৭৪। ২০১৬ পর্যন্ত ছয়তলার ওপরে ইমারত নির্মাণের হার বেড়েছে ৫১৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হলেন ক্যালিফোর্নিয়ার পরিবহন বিশেষজ্ঞ

‘তল্লাশির’ জন্য উসকানি দিয়েছে গুলশানের ওই বাসার সাবেক কেয়ারটেকার: প্রেস উইং

প্রধান উপদেষ্টার আরও দুই বিশেষ সহকারী নিয়োগ

খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মাসুদ আহমেদের সব পদ স্থগিত

টিআইএন নেওয়ার পরে কিন্তু ঘুমাইতে পারবেন না: এনবিআর চেয়ারম্যান

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত