Ajker Patrika

মাতৃত্বে আশার আলো

ডা. ফরিদা ইয়াসমিন সুমি
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৩, ১৪: ৪১
মাতৃত্বে আশার আলো

প্রকৃতিগতভাবে যৌনমিলনের ফলে নারীদেহের অভ্যন্তরে পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু নিষেকের মাধ্যমে ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। এই ভ্রূণ গর্ভাশয় বা জরায়ুর ভেতরের প্রাচীরে সংস্থাপিত হয়ে দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বড় হওয়ার পর ভূমিষ্ঠ হয়। কিন্তু যেসব দম্পতির ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হয় বা সফল হতে পারে না, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় কৃত্রিম উপায়ে গর্ভধারণের। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যৌনমিলন বাদ দিয়ে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন ঘটানো হয়।

বেশির ভাগ মানুষের জীবনের কোনো না কোনো সময় সন্তানের মা-বাবা হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। প্রায় ৮৫ শতাংশ দম্পতি চেষ্টা করার এক বছরের মধ্যে গর্ভধারণ করতে সক্ষম হন। প্রায় ৭ শতাংশ চেষ্টা করার দ্বিতীয় বছরের মধ্যে গর্ভাবস্থা অর্জন করেন। সঠিক নিয়মে চেষ্টা করার ১২ মাসের মধ্যে গর্ভাবস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হলে তাকে বন্ধ্যত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

কৃত্রিম উপায়ে গর্ভধারণ যাঁদের প্রয়োজন

পুরুষের ক্ষেত্রে

  • পুরুষের বীর্যে প্রতিবন্ধকতার কারণে শুক্রাণু না থাকলে
  • শুক্রাণুর পরিমাণ কম থাকলে বা শুক্রাণু গতিশীল না হলে
  • পুরুষাঙ্গ উত্থিত না হওয়ার মতো অসুস্থতা থাকলে

নারীর ক্ষেত্রে

  • নারীর এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে
  • পলিসিস্টিক ওভারি হলে
  • শুক্রাণুর প্রতি নারীর শরীরে অ্যালার্জি বা বাধাগ্রস্ততা তৈরি হলে
  • নারীর ডিম্বাণুর পরিমাণ কমে গেলে
  • নারীর বয়স ৩৫ বা এর বেশি হলে
  • দীর্ঘদিন চেষ্টা করে গর্ভধারণে ব্যর্থ হলে।

কৃত্রিম গর্ভধারণ পদ্ধতি বন্ধ্য দম্পতিদের জন্য আশার আলো হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে এ উপায়ে অনেক বন্ধ্য নারী-পুরুষ সন্তান লাভে সমর্থ হয়েছেন।
এর বাইরে আরেকটি পদ্ধতি রয়েছে, আইইউআই বা ইন্ট্রাইউটেরাইন ইনসেমিনেশন। অবশ্য আইইউআই কৃত্রিম গর্ভধারণ পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এই পদ্ধতিতেও যৌনমিলন ছাড়া স্বামীর শুক্রাণু স্ত্রীর গর্ভে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে গর্ভধারণ করানো হয়। এটি অত্যন্ত সহজে, কম খরচে ও কম সময়ে করা যায়। এর গ্রহণযোগ্যতা তাই বেশি।

মূলত একজন দম্পতির ইতিহাস এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যত্বরোগ বিশেষজ্ঞ সিদ্ধান্ত নেবেন কোন পদ্ধতি কার জন্য উপযুক্ত হবে। কৃত্রিম গর্ভধারণের প্রতিটি পদ্ধতিতেই উর্বরতা বৃদ্ধির ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।

কৃত্রিম উপায়ে গর্ভধারণ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয়। সাধারণত এটি ‘টেস্টটিউব’ পদ্ধতি হিসেবে বেশি পরিচিত। এই পদ্ধতিতে স্ত্রীর ডিম্বাণু বড় করার জন্য ঋতুচক্রের প্রথম ১৪ দিন নির্দিষ্ট কিছু ইনজেকশন দেওয়া হয়। তারপর ট্রান্সভ্যাজাইনাল সনোগ্রাম বা টিভিএস করে দেখা হয় ডিম্বাণুগুলো কাঙ্ক্ষিত আকার-আয়তন, অর্থাৎ ১৮ মিলিমিটার বা এর থেকে বড় হয়েছে কি না। যদি হয়ে থাকে, তখন ডিম্বাণুর পরিপক্বতার জন্য আরেকটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। এই ইনজেকশন দেওয়ার ৩৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টা পর স্ত্রীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। ডিম্বাণু সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি অপারেশন থিয়েটারে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করার মাধ্যমে করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় স্ত্রীর যোনিপথের পেছন অংশ দিয়ে নিডল প্রবেশ করিয়ে আলট্রাসনোগ্রাফির সহায়তায় ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত ডিম্বাণু ল্যাবরেটরিতে স্বামীর শুক্রাণুর সঙ্গে নিষেকের জন্য রাখা হয়। নিষিক্তকরণের পর পাঁচ থেকে ছয় দিনের ভ্রূণটি স্ত্রীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। একে ইটি বা এমব্রায়ো ট্রান্সফার বলা হয়।

আইসিএসআই/ইকসি (ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন) পদ্ধতিতে স্বামীর শুক্রাণু স্ত্রীর ডিম্বাণুর সাইটোপ্লাজম বা কোষের দেহে সরাসরি প্রবেশ করিয়ে নিষিক্তকরণকে ত্বরান্বিত করা হয়। সাধারণত পুরুষের শুক্রাণুর পরিমাণ কম বা শুক্রাণুর অন্যান্য সমস্যায় এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
কৃত্রিম গর্ভধারণের অন্যান্য পদ্ধতির ব্যবহার তুলনামূলক কম এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেগুলো ব্যবহৃত হয়।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, কৃত্রিম উপায়ে গর্ভধারণের হার শতভাগ কি না। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো পদ্ধতিই শতভাগ সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। তা ছাড়া সাফল্যের হারের তারতম্যের বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন

  • নারীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হওয়া
  • মারাত্মক এন্ডোমেট্রিওসিস থাকা
  •  ডিম্বাণু বা শুক্রাণুর গুণগত মান খারাপ হওয়া
  • ডিম্বনালি বন্ধ থাকা বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
  • জরায়ুতে ত্রুটি থাকা
  • কৃত্রিম গর্ভধারণের অন্যান্য সমস্যা।

কৃত্রিম উপায়ে গর্ভধারণের জন্য প্রথমেই একজন স্ত্রী ও বন্ধ্যত্বরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। তিনিই নির্ধারণ করবেন কোন পদ্ধতিটি আপনার জন্য উপযুক্ত। এ ধরনের চিকিৎসায় মনোবল শক্ত রাখা এবং ধৈর্য ধরা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সঠিক পদ্ধতিতে ধৈর্যসহকারে চিকিৎসা নিলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

ডা. ফরিদা ইয়াসমিন সুমি, সহকারী অধ্যাপক, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত