এম আবুল কালাম আজাদ
বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় এক অধ্যায় রচিত হয় জঙ্গিদমন অভিযানে, কিন্তু সেটা মানুষের কাছে অজানাই রয়ে গেছে। এর কারণ হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমে শুধু সরকার ও তার বাহিনীর বয়ান তুলে ধরা, যেখানে কতটা দক্ষতা ও সাফল্যের সঙ্গে তারা জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করেছে সে চিত্র ফুটে উঠত। এর পেছনে যে এক অন্যায় ও অমানবিক দিক রয়েছে তা মিডিয়ায় উঠে আসেনি, ফলে সেটা অন্ধকারেই রয়ে যায়।
আমরা জানি, ২০১৩ সাল থেকে জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত দেশে একের পর এক জঙ্গি হামলা হয়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা হয় হলি আর্টিজান বেকারিতে। এসব হামলায় বিদেশি নাগরিকসহ অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। আওয়ামী লীগ সরকার সেসব হামলা প্রতিহত করতে না পারলেও শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে সংসদে দাবি করেন জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল।
এমন দাবির পেছনে কারণ রয়েছে বলে যুক্তিও দেওয়া হয়। হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর জঙ্গিদের দমনে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ বাড়ে। তাই যেকোনো মূল্যে জঙ্গিদমনে সাফল্য দেখানোর প্রয়োজন। এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দারা জঙ্গিদের আটক করতে মরিয়া হয়ে যায়। আশ্চর্যজনকভাবে হঠাৎ তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একের পর এক জঙ্গি আস্তানা খুঁজে পায় এবং সফল অভিযানে বড় বড় জঙ্গির মৃত্যু ঘটে। একই সঙ্গে শুরু হয় জঙ্গি আটকের হিড়িক। নবগঠিত সিটিটিসি ছাড়াও পুলিশ, র্যাব ও ডিবি দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে শত শত মানুষকে জঙ্গি হিসেবে আটক শুরু করে।
পরিস্থিতি দেখে মনে হয় যে পুরো দেশ জঙ্গিতে ছেয়ে গেছে। বাংলাদেশ যেন এক জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সাংবাদিক হিসেবে জঙ্গিবিরোধী অভিযান ও জঙ্গি আটকের ঘটনা নিয়ে আমাদের মাঝে সন্দেহ জন্মে। অনেকে মনে করে, অভিযান বা আটকের অনেক কিছু সাজানো। তবে যেহেতু তখন কেউ তা খতিয়ে দেখেনি বা আনুসন্ধান করেনি তাই পুলিশের দেওয়া তথ্য বা ন্যারেটিভের বাইরে অন্যকোনো গল্প থাকলেও তা চাপা পড়ে যায়।
দু-তিনটি ঘটনা নিয়ে মিডিয়া আনুসন্ধান করলে ভিন্ন রকম তথ্য বেরিয়ে আসে, যার সঙ্গে পুলিশ বা র্যাবের দেওয়া তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। এ থেকে ধারণা হয়, প্রতিটি ঘটনার পেছনে কোনো না কোনো অন্য গল্প লুকিয়ে আছে।
সে সময় জঙ্গি ধরার এক অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয় বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে। প্রকৃত জঙ্গিদের ধরার পাশাপাশি নিরীহ নারী-পুরুষদের জঙ্গি বানানোর প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। এ ক্ষেত্রে তারা নানান রকম গল্পের আশ্রয় নেয়। কিন্তু কীভাবে, কেন এমন অন্যায় করা হয় তা জানতেই ২০২১ সালে নারী জঙ্গিবাদ নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান শুরু করি। অবাক হয়ে দেখি, জঙ্গিদমনে সাজানো নাটক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপকতা দেখে। ঘটনার যত ভেতরে প্রবেশ করি ততই জানতে পারি র্যাব, পুলিশ, ডিবি একই ধরনের গল্পের অবতারণা করে কীভাবে নিরপরাধ মানুষদের আটক করেছে, অনেককে বড় জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানের অনেক ঘটনাই অসত্য। অর্থাৎ জঙ্গিবাদ ও জঙ্গিদমন অভিযান সম্পর্কে আমরা বাইরে থেকে বা গণমাধ্যম থেকে যা জানি, তার বাইরেও আছে অন্য ঘটনা। সারা দেশ চষে বেড়িয়ে যেসব ঘটনা তুলে এনেছিলাম তার কয়েকটির কথা আজ তুলে ধরলেই বোঝা যাবে কেন ঘটনার পেছনের ঘটনা খুঁজতে হবে।
ভুয়া সুইসাইড স্কোয়াড মেম্বার
২০১৬ সালে সিরাজগঞ্জ জেলা ডিবি পুলিশ চার নারীকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করে জানায় যে, তারা নব্য জেএমবির সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য এবং ফিদায়ি হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ডিবি রাত আড়াইটায় তাদের এক গ্রাম থেকে আটক করে। আটক এক নারীর বাড়িতে তারা গোপন বৈঠক করছিল।
নারীদের মধ্যে ছিল একজন মা ও তার দুই অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে, আর মধ্য বয়সী আরেকজন। যারা দুজনেই নিরক্ষর।
এই ঘটনা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুসারে, অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম আটক নারীদের ছবি ও ভিডিওসহ ফলাও করে রিপোর্ট করে।
অথচ প্রকৃত ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই নারীদের ডিবি পুলিশ এক মাস পূর্বে নিজ নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং সেটা দিনের বেলায় গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে। এরপর তাদের পুলিশ ডিবি অফিসে আটকে রেখে ভয়-ভীতি দেখিয়ে ও শারীরিক নির্যাতন করে জবানবন্দী আদায় করা হয়।
সত্য ঘটনা বের করা কঠিন ছিল না। এই নারীদের সিরাজগাঞ্জ শহর থেকে মাত্র ৩০ মাইল দূরের গ্রাম থেকে তুলে আনা হয়। গণমাধ্যম চাইলেই সেখানে গিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে পারত। তা করা হয়নি। ফলে পুলিশের বানানো গল্প সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, গ্রামের নিরীহ নারীরা সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য হিসেবে খ্যাতি পায়।
সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের এমন ভূমিকায় পুলিশ আরও উৎসাহিত হয়।
সিরাজগঞ্জ ডিবির ওই টিম একই ধরনের আরেকটি ঘটনার জন্ম দেয়। আবার তারা চার নারীকে হাজির করে দাবি করে যে, তাদের শহরের এক বাড়িতে মধ্যরাতে গোপন বৈঠক করার সময় আটক করা হয়। সাংবাদিকেরা এবারও যাচাই বা অনুসন্ধান না করে পুলিশের বক্তব্য হুবহু তুলে ধরে।
এই দুই ঘটনার অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে, ওই নারীদের বাড়ি বিভিন্ন জেলায় এবং ডিবি একেক জনকে একেক স্থান একেক সময়ে তুলে এনে পূর্বের ঘটনার মতো অফিসে আটকে রেখে ও একই কায়দায় জবানবন্দী আদায় করে। এভাবেই তারা সফলভাবে জঙ্গি দমনের একেকটা উদাহরণ তৈরি করতে থাকে।
পহেলা বৈশাখবিরোধী লিফলেট ও ৯ জঙ্গি
২০১৮ সালে রাজশাহী জেলার এক বালিকা বিদ্যালয়ে দুজন ছাত্রী লিফলেট বিলি করে, যেখানে লেখা ছিল পহেলা বৈশাখ পালন করা ইসলামবিরোধী তাই তা পরিহার করা উচিত। তারা স্থানীয় ইসলামি ছাত্রী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ঘটনার তিন দিন পর পুলিশ স্থানীয় এক জামায়াত নেতার বাড়িতে মধ্যরাতে অভিযান করে জামায়াত নেতা, তাঁর স্ত্রী, দুই মেয়ে ও তাঁর ভাইয়ের তিন মেয়েকে তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন সকালে সাংবাদিকদের সামনে তাঁদের উপস্থাপন করে পুলিশ জানায়, আটককৃতরা নব্য জেএমবির সঙ্গে জড়িত, তাঁরা রাত ২টার সময় গোপন বৈঠক করে নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন। বৈঠকে বোমা হামলা চালিয়ে জীবন দিয়ে হলেও তাঁরা পহেলা বৈশাখ উদযাপন প্রতিহত করবে বলে সভায় তাঁরা আলোচনা করেন।
স্থানীয় সাংবাদিকেরা পুলিশের ভাষ্যমতে রিপোর্ট করে।
ওই এলাকায় কয়েকদিন অনুসন্ধানের পর জানা যায়, ঘটনাটা এক ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তার শরিক দলের নেতারা লিফলেটের ঘটনাকে ঘিরে ওই জামায়াত নেতাকে শায়েস্তা করতে চায়। আর তাই মধ্যরাতে অভিযান চালাতে দেরি হয়। স্থানীয় অনেক বাসিন্দা এসব জানেন। জঙ্গি ধরতে পুলিশ এতোটাই বেপরোয়া হয় যে, ওই ঘটনায় করা মামলায় তারা দূরের আরেকটি গ্রাম থেকে জামায়াত নেতার আত্মীয় দুজন নারীকে আটক করে।
স্থানীয় এক সাংবাদিক জানান, তিনি প্রকৃত ঘটনা জানলেও সেটা নিয়ে রিপোর্ট করার সাহস পাননি।
২ দিনব্যাপী বন্দুক যুদ্ধ, ২টি লাশ
২০১৭ সালের এপ্রিলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পেয়ে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার যোগে জঙ্গি অভিযানে পারদর্শী সিটিটিসি ও সোয়াতের সদস্যরা সেখানে যায়। গ্রামবাসীদের সরিয়ে দিয়ে জঙ্গিদের সঙ্গে দুই দিনব্যাপী গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যেন বড় এক সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ হচ্ছে। দুই দিন পর আস্তানার বাড়িতে ঢুকে পুলিশ দুটি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে। দাবি করে, এরা নিজেরা বোমা ফাটিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পায়ে গুলিবদ্ধ এক অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তাঁর শিশুকন্যাকে উদ্ধার করে পুলিশ। এমন ভাষ্য সব মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়।
পুলিশের নথিতে বলা হয়, পুলিশ মোট ২ হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এর বিপরীতে জঙ্গিদের দিক থেকেও অনেক গুলি করার কথা। সে ক্ষেত্রে জঙ্গিদের কাছে ভারি অস্ত্র ও গুলি থাকার কথা। কিন্তু তার প্রমাণ অভিযান শেষে পাওয়া যায়নি।
আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত বাড়ির দেয়ালে অনেক গুলির দাগ থাকলেও আশপাশের কোনো বাড়ির দেয়ালে দেখা যায়নি। জঙ্গিরা গুলি করলে তা থাকার কথা।
এখানেও সন্দেহের অনেক উপাদান থাকায় অনুসন্ধানে করতে নেমে অন্যরকম তথ্য পাওয়া যায়। আহত নারী ও তাঁর স্বামী যে বাড়িতে বসবাস করতেন সেটি ছিল এক প্রবাসীর। তিনি তাঁদের সেখানে থাকতে দিয়েছিলেন। ওই নারীর স্বামী যাকে পুলিশ বড় জঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে খুব ধার্মিক ও ভিন্নভাবে নামাজ পড়ার কারণে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখত বলে আহত নারী ও আশপাশের গ্রামবাসীরা জানায়।
অন্য যে ব্যক্তির লাশ সেখানে পাওয়া গেছে তিনি বড় জঙ্গি ছিলেন। ওই জঙ্গি ঢাকার ডিবি অফিস থেকে পালিয়ে যান। তবে পুলিশ তাঁকে আবার আটক করে। অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশের দুজন সদস্য জানান, তাঁকে আগেই মেরে লাশ ওই বাড়িতে নেওয়া হয়েছিল। আর আহত নারীর স্বামীকে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক গুলি করা হয় বলে তাঁরা জানান।
ফলে মধ্যরাতের অনেক গোপন বৈঠক আসলেই যে সংগঠিত হয়নি এগুলো তার প্রমাণ।
সত্যিকার অর্থে প্রায় সব জঙ্গি ঘটনার পেছনে কোনো না কোনো গল্প আছে যা আমরা জানি না।
যেমন, ২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর আশকোনায় শাকিরা নামের এক নারী আত্মঘাতী হামলা চালায়। দেশের ইতিহাসে সেটা প্রথম। সারা দুনিয়ার মিডিয়ায় সেটা প্রকাশিত হয়। আত্মসমর্পণ না করে ওই নারী তার কোমরে বেঁধে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে সেখানে তার মৃত্যু হয়। সঙ্গে থাকা তার মেয়ে আহত হলেও উপস্থিত কোনো পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়নি।
এই ঘটনা নিয়ে কেউ সন্দেহ পোষণ করেনি। তবে এর সঙ্গেও অন্য এক সত্য লুকিয়ে আছে। আর তা হলো, শাকিরাকে খুব কাছে থেকে গুলি করা হয়, যা সিটিটিসি একাধিক সদস্য নিশ্চিত করেছে।
সোয়াতের এক শুটার যিনি সে সময় উপস্থিত ছিলেন সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, তিনি নিজেও কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়েন এবং সেগুলো শাকিরাকে বিদ্ধ করে। মজার ব্যাপার হলো, শাকিরার পোস্টমর্টেম রিপোর্টে গুলির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এমন ঘটনাও ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। শাকিরা আত্মঘাতী হয়েছে, নাকি গুলিতে মারা গেছে সে প্রশ্ন অমীমাংসিত।
বাংলাদেশের নারী জঙ্গিদের আগাপাশতলা জানতে প্রায় তিন বছর আমরা গবেষণা করেছি। গবষেণালব্ধ ফল জার্মানি থেকে ২০২৩ সালে ‘উইমেন ইন টেরোরিজম ইন বাংলাদেশ’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বইটির সহ-লেখক জার্মান গবেষক ও লেখক ড. ইয়াসমিন লরচ।
সেই বইয়ে নিহত শাকিরার ঘটনার মতো আরো অনেক কাহিনীর বর্ণনা উঠে এসেছে।
যৌথ এই গবেষণায় বেরিয়ে আসে, ১২০ জন নারীকে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়েছে, যাদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ছিলেন নিরপরাধ। এই সংখ্যা পুরুষ জঙ্গিদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি বলে পুলিশ ও র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
জঙ্গি দমনে নাটক কেন?
জঙ্গি দমনে হাসিনা সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ছাড়াও সফল জঙ্গিবিরোধী অভিযান ও জঙ্গি ধরার জন্য বিশেষ প্রণোদনা, পুরস্কার, পদোন্নতি, ভালো পদায়ন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় আকর্ষণের বিষয় ছিল মিডিয়ায় ব্যাপক কাভারেজ।
২০১৬ সাল থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে জঙ্গি ধরার এক অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যে যত সফল জঙ্গি অভিযান ও জঙ্গি আটক করেছে তারা ততই বাহিনী ও সরকারের বাহাবা পেয়েছে। বিপিএম ও পিপিএম তো ছিলই। ফলে এই প্রতিযোগিতা মাঠ পর্যায়ের পুলিশের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
আবার অভিযানের ঘটনাকে বড় করে দেখানো হয় বেশি মিডিয়া কাভারেজ ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য। প্রমাণ করার চেষ্টা হয় যে, ভয়ঙ্কর জঙ্গিদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই পুলিশ দমন করতে পারে।
২০১৫ সাল থেকে নারী জঙ্গির সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়। যেহেতু নারীদের সংবাদমূল্য বেশি ফলে প্রকৃত নারী জঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গিবাদে জড়িত না এমন অনেককে আটক করা হয়। নারীদের একটা গ্রুপ হিসেবে দেখালে গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এই প্রবণতা প্রবল আকার ধারণ করে।
গবেষণা ও অনুসন্ধানের সময় অনেক পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তা তথ্য ও নথি দিয়ে সহায়তা করেন।
এদের অনেকে জানিয়েছেন কীভাবে তৈরি গল্পের মাধ্যমে নিরাপরাধ নারী-পুরুষদের জঙ্গি বানানো হয়েছে। আর এটা বেশি করেছে র্যাব। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে এটা করতে হয়েছে বলেও দাবি তাদের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্র্যাপ করে কিছু ধার্মিক ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে ধরা হয়, সে তথ্য অবলীলায় স্বীকার করেছেন দুই কর্মকর্তা।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে সবাই জানতেন কীভাবে এমন অন্যায় কাজ করা হচ্ছে। সবাই নীরব ছিলেন। কারণ এ থেকে তাঁরা নিজেরা ও সরকার বড় ধরনের সুবিধা পেত।
ব্যাপারটা সরকারের ভেতরে অজানা ছিল না। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক শহিদুল হকের লেখা বই থেকে এর প্রমাণ মেলে। তিনি তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, পান্থপথে জঙ্গি অভিযানের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে বলেছিলেন, এখানে এসে এমন নাটক না করলেও পারতে।
প্রকৃত ও ফেইক জঙ্গি সবাই নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়। ধনী পরিবারের সদস্য ছাড়া কেউই সহজে আইনি সুবিধা পায়নি, জামিনও পায়নি। জঙ্গিদের আইনি সহযোগিতা না দেওয়ার জন্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক নিজেই উকিলদের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
এটা নিরপরাধ ব্যক্তিদের জন্য বেশি মর্মান্তিক। একদিকে তারা জঙ্গিবাদে জড়িত না, অন্যদিকে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আইনি লড়াইয়ের জন্য উকিল না পাওয়া, বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকা তাদের জন্য অনেক বড় অন্যায়। জামিনের পর মামলার ঘানি বয়ে বেড়ানো তো আছেই।
একজন নিরপরাধ নারী বা পুরুষকে জঙ্গি তকমা দিলে তার ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যায়। এই কালিমা তার পক্ষে মুছে ফেলা সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রের সব ধরনের সুবিধা থেকে সে বঞ্চিত হয়। চাকরি না পেয়ে তারা পরিবার ও সমাজে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তারা অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের কাছে জঙ্গিবাদ বড় একটি রাজনৈতিক কার্ড ছিল। এই কার্ড তারা শেষ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করেছে। কিন্তু জঙ্গি দমনের নামে বড় সংখ্যক নিরপরাধ মানুষের ওপর অত্যাচার ও তাদের মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করা বড় ধরনের অন্যায়। কিন্তু মিডিয়া জেনে অথবা না জেনে বিষয়টি এড়িয়ে যায় বলে এখনো মানুষ সে সম্পর্কে জানে না।
মিডিয়া যে কোনো ঘটনা বিনা প্রশ্নে বা খতিয়ে দেখা ছাড়া প্রকাশ করলে সেটা মানুষ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ বয়ে আনে না, বরং অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে যায়। জঙ্গিবাদ সাংবাদিকতা এর বড় উদাহরণ।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক
বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় এক অধ্যায় রচিত হয় জঙ্গিদমন অভিযানে, কিন্তু সেটা মানুষের কাছে অজানাই রয়ে গেছে। এর কারণ হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমে শুধু সরকার ও তার বাহিনীর বয়ান তুলে ধরা, যেখানে কতটা দক্ষতা ও সাফল্যের সঙ্গে তারা জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করেছে সে চিত্র ফুটে উঠত। এর পেছনে যে এক অন্যায় ও অমানবিক দিক রয়েছে তা মিডিয়ায় উঠে আসেনি, ফলে সেটা অন্ধকারেই রয়ে যায়।
আমরা জানি, ২০১৩ সাল থেকে জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত দেশে একের পর এক জঙ্গি হামলা হয়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা হয় হলি আর্টিজান বেকারিতে। এসব হামলায় বিদেশি নাগরিকসহ অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। আওয়ামী লীগ সরকার সেসব হামলা প্রতিহত করতে না পারলেও শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে সংসদে দাবি করেন জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল।
এমন দাবির পেছনে কারণ রয়েছে বলে যুক্তিও দেওয়া হয়। হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর জঙ্গিদের দমনে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ বাড়ে। তাই যেকোনো মূল্যে জঙ্গিদমনে সাফল্য দেখানোর প্রয়োজন। এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দারা জঙ্গিদের আটক করতে মরিয়া হয়ে যায়। আশ্চর্যজনকভাবে হঠাৎ তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একের পর এক জঙ্গি আস্তানা খুঁজে পায় এবং সফল অভিযানে বড় বড় জঙ্গির মৃত্যু ঘটে। একই সঙ্গে শুরু হয় জঙ্গি আটকের হিড়িক। নবগঠিত সিটিটিসি ছাড়াও পুলিশ, র্যাব ও ডিবি দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে শত শত মানুষকে জঙ্গি হিসেবে আটক শুরু করে।
পরিস্থিতি দেখে মনে হয় যে পুরো দেশ জঙ্গিতে ছেয়ে গেছে। বাংলাদেশ যেন এক জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সাংবাদিক হিসেবে জঙ্গিবিরোধী অভিযান ও জঙ্গি আটকের ঘটনা নিয়ে আমাদের মাঝে সন্দেহ জন্মে। অনেকে মনে করে, অভিযান বা আটকের অনেক কিছু সাজানো। তবে যেহেতু তখন কেউ তা খতিয়ে দেখেনি বা আনুসন্ধান করেনি তাই পুলিশের দেওয়া তথ্য বা ন্যারেটিভের বাইরে অন্যকোনো গল্প থাকলেও তা চাপা পড়ে যায়।
দু-তিনটি ঘটনা নিয়ে মিডিয়া আনুসন্ধান করলে ভিন্ন রকম তথ্য বেরিয়ে আসে, যার সঙ্গে পুলিশ বা র্যাবের দেওয়া তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। এ থেকে ধারণা হয়, প্রতিটি ঘটনার পেছনে কোনো না কোনো অন্য গল্প লুকিয়ে আছে।
সে সময় জঙ্গি ধরার এক অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয় বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে। প্রকৃত জঙ্গিদের ধরার পাশাপাশি নিরীহ নারী-পুরুষদের জঙ্গি বানানোর প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। এ ক্ষেত্রে তারা নানান রকম গল্পের আশ্রয় নেয়। কিন্তু কীভাবে, কেন এমন অন্যায় করা হয় তা জানতেই ২০২১ সালে নারী জঙ্গিবাদ নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান শুরু করি। অবাক হয়ে দেখি, জঙ্গিদমনে সাজানো নাটক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপকতা দেখে। ঘটনার যত ভেতরে প্রবেশ করি ততই জানতে পারি র্যাব, পুলিশ, ডিবি একই ধরনের গল্পের অবতারণা করে কীভাবে নিরপরাধ মানুষদের আটক করেছে, অনেককে বড় জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানের অনেক ঘটনাই অসত্য। অর্থাৎ জঙ্গিবাদ ও জঙ্গিদমন অভিযান সম্পর্কে আমরা বাইরে থেকে বা গণমাধ্যম থেকে যা জানি, তার বাইরেও আছে অন্য ঘটনা। সারা দেশ চষে বেড়িয়ে যেসব ঘটনা তুলে এনেছিলাম তার কয়েকটির কথা আজ তুলে ধরলেই বোঝা যাবে কেন ঘটনার পেছনের ঘটনা খুঁজতে হবে।
ভুয়া সুইসাইড স্কোয়াড মেম্বার
২০১৬ সালে সিরাজগঞ্জ জেলা ডিবি পুলিশ চার নারীকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করে জানায় যে, তারা নব্য জেএমবির সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য এবং ফিদায়ি হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ডিবি রাত আড়াইটায় তাদের এক গ্রাম থেকে আটক করে। আটক এক নারীর বাড়িতে তারা গোপন বৈঠক করছিল।
নারীদের মধ্যে ছিল একজন মা ও তার দুই অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে, আর মধ্য বয়সী আরেকজন। যারা দুজনেই নিরক্ষর।
এই ঘটনা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুসারে, অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম আটক নারীদের ছবি ও ভিডিওসহ ফলাও করে রিপোর্ট করে।
অথচ প্রকৃত ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই নারীদের ডিবি পুলিশ এক মাস পূর্বে নিজ নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং সেটা দিনের বেলায় গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে। এরপর তাদের পুলিশ ডিবি অফিসে আটকে রেখে ভয়-ভীতি দেখিয়ে ও শারীরিক নির্যাতন করে জবানবন্দী আদায় করা হয়।
সত্য ঘটনা বের করা কঠিন ছিল না। এই নারীদের সিরাজগাঞ্জ শহর থেকে মাত্র ৩০ মাইল দূরের গ্রাম থেকে তুলে আনা হয়। গণমাধ্যম চাইলেই সেখানে গিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে পারত। তা করা হয়নি। ফলে পুলিশের বানানো গল্প সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, গ্রামের নিরীহ নারীরা সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য হিসেবে খ্যাতি পায়।
সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের এমন ভূমিকায় পুলিশ আরও উৎসাহিত হয়।
সিরাজগঞ্জ ডিবির ওই টিম একই ধরনের আরেকটি ঘটনার জন্ম দেয়। আবার তারা চার নারীকে হাজির করে দাবি করে যে, তাদের শহরের এক বাড়িতে মধ্যরাতে গোপন বৈঠক করার সময় আটক করা হয়। সাংবাদিকেরা এবারও যাচাই বা অনুসন্ধান না করে পুলিশের বক্তব্য হুবহু তুলে ধরে।
এই দুই ঘটনার অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে, ওই নারীদের বাড়ি বিভিন্ন জেলায় এবং ডিবি একেক জনকে একেক স্থান একেক সময়ে তুলে এনে পূর্বের ঘটনার মতো অফিসে আটকে রেখে ও একই কায়দায় জবানবন্দী আদায় করে। এভাবেই তারা সফলভাবে জঙ্গি দমনের একেকটা উদাহরণ তৈরি করতে থাকে।
পহেলা বৈশাখবিরোধী লিফলেট ও ৯ জঙ্গি
২০১৮ সালে রাজশাহী জেলার এক বালিকা বিদ্যালয়ে দুজন ছাত্রী লিফলেট বিলি করে, যেখানে লেখা ছিল পহেলা বৈশাখ পালন করা ইসলামবিরোধী তাই তা পরিহার করা উচিত। তারা স্থানীয় ইসলামি ছাত্রী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ঘটনার তিন দিন পর পুলিশ স্থানীয় এক জামায়াত নেতার বাড়িতে মধ্যরাতে অভিযান করে জামায়াত নেতা, তাঁর স্ত্রী, দুই মেয়ে ও তাঁর ভাইয়ের তিন মেয়েকে তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন সকালে সাংবাদিকদের সামনে তাঁদের উপস্থাপন করে পুলিশ জানায়, আটককৃতরা নব্য জেএমবির সঙ্গে জড়িত, তাঁরা রাত ২টার সময় গোপন বৈঠক করে নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন। বৈঠকে বোমা হামলা চালিয়ে জীবন দিয়ে হলেও তাঁরা পহেলা বৈশাখ উদযাপন প্রতিহত করবে বলে সভায় তাঁরা আলোচনা করেন।
স্থানীয় সাংবাদিকেরা পুলিশের ভাষ্যমতে রিপোর্ট করে।
ওই এলাকায় কয়েকদিন অনুসন্ধানের পর জানা যায়, ঘটনাটা এক ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তার শরিক দলের নেতারা লিফলেটের ঘটনাকে ঘিরে ওই জামায়াত নেতাকে শায়েস্তা করতে চায়। আর তাই মধ্যরাতে অভিযান চালাতে দেরি হয়। স্থানীয় অনেক বাসিন্দা এসব জানেন। জঙ্গি ধরতে পুলিশ এতোটাই বেপরোয়া হয় যে, ওই ঘটনায় করা মামলায় তারা দূরের আরেকটি গ্রাম থেকে জামায়াত নেতার আত্মীয় দুজন নারীকে আটক করে।
স্থানীয় এক সাংবাদিক জানান, তিনি প্রকৃত ঘটনা জানলেও সেটা নিয়ে রিপোর্ট করার সাহস পাননি।
২ দিনব্যাপী বন্দুক যুদ্ধ, ২টি লাশ
২০১৭ সালের এপ্রিলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পেয়ে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার যোগে জঙ্গি অভিযানে পারদর্শী সিটিটিসি ও সোয়াতের সদস্যরা সেখানে যায়। গ্রামবাসীদের সরিয়ে দিয়ে জঙ্গিদের সঙ্গে দুই দিনব্যাপী গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যেন বড় এক সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ হচ্ছে। দুই দিন পর আস্তানার বাড়িতে ঢুকে পুলিশ দুটি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে। দাবি করে, এরা নিজেরা বোমা ফাটিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পায়ে গুলিবদ্ধ এক অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তাঁর শিশুকন্যাকে উদ্ধার করে পুলিশ। এমন ভাষ্য সব মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়।
পুলিশের নথিতে বলা হয়, পুলিশ মোট ২ হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এর বিপরীতে জঙ্গিদের দিক থেকেও অনেক গুলি করার কথা। সে ক্ষেত্রে জঙ্গিদের কাছে ভারি অস্ত্র ও গুলি থাকার কথা। কিন্তু তার প্রমাণ অভিযান শেষে পাওয়া যায়নি।
আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত বাড়ির দেয়ালে অনেক গুলির দাগ থাকলেও আশপাশের কোনো বাড়ির দেয়ালে দেখা যায়নি। জঙ্গিরা গুলি করলে তা থাকার কথা।
এখানেও সন্দেহের অনেক উপাদান থাকায় অনুসন্ধানে করতে নেমে অন্যরকম তথ্য পাওয়া যায়। আহত নারী ও তাঁর স্বামী যে বাড়িতে বসবাস করতেন সেটি ছিল এক প্রবাসীর। তিনি তাঁদের সেখানে থাকতে দিয়েছিলেন। ওই নারীর স্বামী যাকে পুলিশ বড় জঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে খুব ধার্মিক ও ভিন্নভাবে নামাজ পড়ার কারণে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখত বলে আহত নারী ও আশপাশের গ্রামবাসীরা জানায়।
অন্য যে ব্যক্তির লাশ সেখানে পাওয়া গেছে তিনি বড় জঙ্গি ছিলেন। ওই জঙ্গি ঢাকার ডিবি অফিস থেকে পালিয়ে যান। তবে পুলিশ তাঁকে আবার আটক করে। অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশের দুজন সদস্য জানান, তাঁকে আগেই মেরে লাশ ওই বাড়িতে নেওয়া হয়েছিল। আর আহত নারীর স্বামীকে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক গুলি করা হয় বলে তাঁরা জানান।
ফলে মধ্যরাতের অনেক গোপন বৈঠক আসলেই যে সংগঠিত হয়নি এগুলো তার প্রমাণ।
সত্যিকার অর্থে প্রায় সব জঙ্গি ঘটনার পেছনে কোনো না কোনো গল্প আছে যা আমরা জানি না।
যেমন, ২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর আশকোনায় শাকিরা নামের এক নারী আত্মঘাতী হামলা চালায়। দেশের ইতিহাসে সেটা প্রথম। সারা দুনিয়ার মিডিয়ায় সেটা প্রকাশিত হয়। আত্মসমর্পণ না করে ওই নারী তার কোমরে বেঁধে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে সেখানে তার মৃত্যু হয়। সঙ্গে থাকা তার মেয়ে আহত হলেও উপস্থিত কোনো পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়নি।
এই ঘটনা নিয়ে কেউ সন্দেহ পোষণ করেনি। তবে এর সঙ্গেও অন্য এক সত্য লুকিয়ে আছে। আর তা হলো, শাকিরাকে খুব কাছে থেকে গুলি করা হয়, যা সিটিটিসি একাধিক সদস্য নিশ্চিত করেছে।
সোয়াতের এক শুটার যিনি সে সময় উপস্থিত ছিলেন সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, তিনি নিজেও কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়েন এবং সেগুলো শাকিরাকে বিদ্ধ করে। মজার ব্যাপার হলো, শাকিরার পোস্টমর্টেম রিপোর্টে গুলির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এমন ঘটনাও ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। শাকিরা আত্মঘাতী হয়েছে, নাকি গুলিতে মারা গেছে সে প্রশ্ন অমীমাংসিত।
বাংলাদেশের নারী জঙ্গিদের আগাপাশতলা জানতে প্রায় তিন বছর আমরা গবেষণা করেছি। গবষেণালব্ধ ফল জার্মানি থেকে ২০২৩ সালে ‘উইমেন ইন টেরোরিজম ইন বাংলাদেশ’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বইটির সহ-লেখক জার্মান গবেষক ও লেখক ড. ইয়াসমিন লরচ।
সেই বইয়ে নিহত শাকিরার ঘটনার মতো আরো অনেক কাহিনীর বর্ণনা উঠে এসেছে।
যৌথ এই গবেষণায় বেরিয়ে আসে, ১২০ জন নারীকে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়েছে, যাদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ছিলেন নিরপরাধ। এই সংখ্যা পুরুষ জঙ্গিদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি বলে পুলিশ ও র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
জঙ্গি দমনে নাটক কেন?
জঙ্গি দমনে হাসিনা সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ছাড়াও সফল জঙ্গিবিরোধী অভিযান ও জঙ্গি ধরার জন্য বিশেষ প্রণোদনা, পুরস্কার, পদোন্নতি, ভালো পদায়ন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় আকর্ষণের বিষয় ছিল মিডিয়ায় ব্যাপক কাভারেজ।
২০১৬ সাল থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে জঙ্গি ধরার এক অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যে যত সফল জঙ্গি অভিযান ও জঙ্গি আটক করেছে তারা ততই বাহিনী ও সরকারের বাহাবা পেয়েছে। বিপিএম ও পিপিএম তো ছিলই। ফলে এই প্রতিযোগিতা মাঠ পর্যায়ের পুলিশের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
আবার অভিযানের ঘটনাকে বড় করে দেখানো হয় বেশি মিডিয়া কাভারেজ ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য। প্রমাণ করার চেষ্টা হয় যে, ভয়ঙ্কর জঙ্গিদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই পুলিশ দমন করতে পারে।
২০১৫ সাল থেকে নারী জঙ্গির সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়। যেহেতু নারীদের সংবাদমূল্য বেশি ফলে প্রকৃত নারী জঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গিবাদে জড়িত না এমন অনেককে আটক করা হয়। নারীদের একটা গ্রুপ হিসেবে দেখালে গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এই প্রবণতা প্রবল আকার ধারণ করে।
গবেষণা ও অনুসন্ধানের সময় অনেক পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তা তথ্য ও নথি দিয়ে সহায়তা করেন।
এদের অনেকে জানিয়েছেন কীভাবে তৈরি গল্পের মাধ্যমে নিরাপরাধ নারী-পুরুষদের জঙ্গি বানানো হয়েছে। আর এটা বেশি করেছে র্যাব। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে এটা করতে হয়েছে বলেও দাবি তাদের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্র্যাপ করে কিছু ধার্মিক ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে ধরা হয়, সে তথ্য অবলীলায় স্বীকার করেছেন দুই কর্মকর্তা।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে সবাই জানতেন কীভাবে এমন অন্যায় কাজ করা হচ্ছে। সবাই নীরব ছিলেন। কারণ এ থেকে তাঁরা নিজেরা ও সরকার বড় ধরনের সুবিধা পেত।
ব্যাপারটা সরকারের ভেতরে অজানা ছিল না। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক শহিদুল হকের লেখা বই থেকে এর প্রমাণ মেলে। তিনি তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, পান্থপথে জঙ্গি অভিযানের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে বলেছিলেন, এখানে এসে এমন নাটক না করলেও পারতে।
প্রকৃত ও ফেইক জঙ্গি সবাই নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়। ধনী পরিবারের সদস্য ছাড়া কেউই সহজে আইনি সুবিধা পায়নি, জামিনও পায়নি। জঙ্গিদের আইনি সহযোগিতা না দেওয়ার জন্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক নিজেই উকিলদের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
এটা নিরপরাধ ব্যক্তিদের জন্য বেশি মর্মান্তিক। একদিকে তারা জঙ্গিবাদে জড়িত না, অন্যদিকে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আইনি লড়াইয়ের জন্য উকিল না পাওয়া, বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকা তাদের জন্য অনেক বড় অন্যায়। জামিনের পর মামলার ঘানি বয়ে বেড়ানো তো আছেই।
একজন নিরপরাধ নারী বা পুরুষকে জঙ্গি তকমা দিলে তার ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যায়। এই কালিমা তার পক্ষে মুছে ফেলা সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রের সব ধরনের সুবিধা থেকে সে বঞ্চিত হয়। চাকরি না পেয়ে তারা পরিবার ও সমাজে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তারা অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের কাছে জঙ্গিবাদ বড় একটি রাজনৈতিক কার্ড ছিল। এই কার্ড তারা শেষ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করেছে। কিন্তু জঙ্গি দমনের নামে বড় সংখ্যক নিরপরাধ মানুষের ওপর অত্যাচার ও তাদের মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করা বড় ধরনের অন্যায়। কিন্তু মিডিয়া জেনে অথবা না জেনে বিষয়টি এড়িয়ে যায় বলে এখনো মানুষ সে সম্পর্কে জানে না।
মিডিয়া যে কোনো ঘটনা বিনা প্রশ্নে বা খতিয়ে দেখা ছাড়া প্রকাশ করলে সেটা মানুষ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ বয়ে আনে না, বরং অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে যায়। জঙ্গিবাদ সাংবাদিকতা এর বড় উদাহরণ।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক
বিজয় দিবস উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এক্স হ্যান্ডেলে দেওয়া একটি পোস্ট নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সব গণমাধ্যমেই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি
১ দিন আগেঅন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণার পর বিষয়টি নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে তারা এ নিয়ে দলের বক্তব্য স্পষ্ট ক
১ দিন আগেডিসেম্বর মাসে এসে বোঝা যাচ্ছিল, পাকিস্তানিদের চাপিয়ে দেওয়া সেন্সরশিপ সেভাবে কাজ করছে না। বহু খবরই তখন প্রকাশিত হচ্ছিল অবরুদ্ধ নগরীর সংবাদপত্রে। ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন কিংবা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিবৃতি একই দিনে প্রকাশিত হলো। সেদিন ইত্তেফাক ‘পিটুনি কর’ বিষয়ক রিপোর্টটির যে শিরোনাম করেছিল,
১ দিন আগেপৃথিবীতে গণহত্যা কিংবা জেনোসাইড কম হয়নি। যত যুদ্ধের যত গণকবর রয়েছে, সেগুলো বর্বরতার সাক্ষ্য দেয়, ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হলোকাস্টে নিহত মানুষের গণকবর যেমন সাক্ষ্য দেয়, রুয়ান্ডার নিয়াবারোঙ্গো নদীও সাক্ষ্য দেয়, তার বুক দিয়ে ভেসে গেছে রক্তস্নাত মানুষের লাশ। তবে বর্বরতার চরম মাত্রা মনে
১ দিন আগে