মহিউদ্দিন খান মোহন
হঠাৎ করেই দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সবার হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট হয়ে গেছে। মাসাধিককালের আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগ। দেশে এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারে, তা কারোরই ধারণায় ছিল না।
এমনকি আমিও ভাবতে পারিনি এই স্বল্পকালীন আন্দোলন শেখ হাসিনাকে কাবু করতে পারবে। পরিচিতজনেরা আন্দোলনের পরিণতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমি তাই বলতাম, শেখ হাসিনা এবারও হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবেন। কিন্তু প্রমাণিত হলো, সবার সব ধারণা সব সময় সঠিক হয় না। যেমন হয়নি এবার আমার ধারণাও।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যখন জনসম্পৃক্তি বেড়েই চলছিল, তখন অনেকেই শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ওদের ডেকে কথা বলতে, দাবি পূরণ করতে। কিন্তু তিনি তা কানে নেননি; বরং তাঁর দলের সাধারণ সম্পাদক ‘ছাত্রলীগ’কে দিয়ে আন্দোলনকারীদের দমনের কথা বলার পর আন্দোলনের লেলিহান শিখা জ্বলে ওঠে। গোটা পরিস্থিতি চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
সংঘাত-সংঘর্ষে কয়েক শ মানুষের প্রাণহানি এবং কয়েক হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদ বিনষ্ট হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। খবর অনুযায়ী, তিনি এখন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
চেষ্টা করছেন অন্য কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার। শেখ হাসিনার এই পতনের উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আন্দোলনের মুখে একাধিক সরকারের পতন হলেও কোনো সরকারপ্রধান দেশত্যাগ করেননি। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হলেও তিনি পালিয়ে যাননি। আর ১৯৯৬ সালে আন্দোলনের চাপে পদত্যাগে বাধ্য হলেও খালেদা জিয়া দেশ ছেড়ে যাননি। এমনকি ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সরকার তাঁকে জোরপূর্বক বিদেশে পাঠিয়ে দিতে চাইলেও খালেদা জিয়া সম্মত হননি। তিনি ওই সরকারকে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, ‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, বাংলাদেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।
বাঁচলে এ দেশেই বাঁচব, মরলে এ দেশেই মরব।’ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশে থেকে মোকাবিলার এই সাহস খালেদা জিয়াকে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নেতায় পরিণত করেছে।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা তেমন সাহস দেখাতে পারেননি। তিনি গোপনে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। বীর সেনাপতিরা কখনো যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায় না। শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতি করতে গিয়ে অসংখ্যবার জেলে গেছেন। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান তাঁকে আগরতলা মামলার আসামি করে ফাঁসিতে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তিনি পালিয়ে যাননি।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই ইচ্ছে করলে পালিয়ে যেতে পারতেন। শেখ হাসিনা এত দিন দেশের জন্য তাঁর পিতার মতো বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়ার কথা বলতেন। কিন্তু বিপদ সমাসন্ন দেখে লাখ লাখ নেতা-কর্মীকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে বোনকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। একজন রাজনৈতিক নেতার এই অন্তর্ধান যে কত বড় গ্লানিকর, তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই জানেন। হয়তো শেখ হাসিনাও এখন তাঁর কৃতকর্মের কথা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন।
দীর্ঘ দেড় দশক দোর্দণ্ড প্রতাপে বাংলাদেশ শাসন করেছেন শেখ হাসিনা। তবে ক্ষমতার মসনদে তাঁর এই অধিষ্ঠান কখনোই প্রশ্নমুক্ত ছিল না। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশে-বিদেশে কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল ভোটারবিহীন। ২০১৮ সালে দিনের ভোট আগের রাতেই সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। আর তাঁর সর্বশেষ নির্বাচন, যেটি এ বছর ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেটাকে নির্বাচন-নির্বাচন খেলা বললে অত্যুক্তি হবে না। নিজ দলের নেতাদের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বানিয়ে যে নির্বাচন তিনি জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন, তা ছিল হাস্যকর। একই দলের নেতারা অবতীর্ণ হয়েছিলেন নির্বাচনী লড়াইয়ে। আর সেটা করতে গিয়ে ১৯৫৪ সাল থেকে ব্যবহৃত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকাকেও বিসর্জন দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা এবং তাঁর দলের নেতারা নিজেদের বিপুল জনপ্রিয় বলে দাবি করতেন। অথচ সেই জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একমাত্র নিক্তি ভোটকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার সাহস পাননি। হাইস্কুলে আমাদের অঙ্কের শিক্ষক আবদুল লতিফ স্যার বলতেন, ‘ফলাফল মেলাতে গিয়ে কেউ অঙ্কে “গোঁজামিল” দিয়ো না। আমার কাছে কিন্তু ধরা পড়ে যাবে।’ শেখ হাসিনা ভোটের বেলায় গোঁজামিল দিয়েছিলেন।
প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, ‘আপনি সব লোককে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারবেন, কিছু লোককে সব সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারবেন। তবে আপনি সব লোককে সব সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারবেন না।’ এ উক্তিটি জানা থাকলেও শেখ হাসিনা যে বিস্মৃত হয়েছিলেন, তা অনুমেয়। নাহলে জনগণ তথা ভোটারদের চোখে ‘লাগ ভেলকি লাগ’ বলে মনঃপূত ধুলো ছিটিয়ে পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘরে তুলতেন না।
গত সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সরকার কোনো ভালো কাজ যে করেনি তা কিন্তু নয়। এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী নদীর টানেল, ফ্লাইওভারসহ বড় বড় সব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশ্য এসব প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দ ও বরাদ্দ অর্থের ব্যবহার নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই একটি জাতিকে তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নয়। মানুষ খাওয়া-পরার পাশাপাশি কথা বলার অধিকার চায়; যেটাকে বলে বাক্স্বাধীনতা। বাক্স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ।
যে যত সাফাই গাক না কেন, এটা শিকার করতেই হবে যে শেখ হাসিনার পুরো আমলে বাংলাদেশে আক্ষরিক অর্থে গণতন্ত্র ছিল না। যেটা ছিল, তা হলো গণতন্ত্রের রেপ্লিকা। উদাহরণ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত তাজমহলের কথা বলা যায়। স্থাপনাটি দেখতে অবিকল তাজমহলের মতো, কিন্তু ওটার ভেতরে সম্রাজ্ঞী মমতাজের সমাধি নেই। তেমনি গত সাড়ে ১৫ বছর দেশে গণতন্ত্রের একটি বাতাবরণ তৈরি করে রাখা হয়েছিল, কিন্তু তা প্রকৃত গণতন্ত্র ছিল না।
না ছিল বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ-মিছিলের অধিকার, না ছিল হাত খুলে পত্রিকায় কলাম লেখার সুযোগ। টিভি টক শোতে সত্য উচ্চারণের সুযোগও ছিল না। সরকার কিংবা মন্ত্রী সাহেবানদের সমালোচনা করলে পড়তে হতো সংশ্লিষ্টদের রোষানলে। কখনো অলিখিত নির্দেশে বন্ধ হয়ে যেত কলাম ছাপানো, আবার কখনো টিভি টক শোতে অংশ নেওয়ার ডাক বন্ধ হয়ে যেত।
এ বিষয়ে অত্র নিবন্ধের লেখকের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। মূলত দেশের গণতন্ত্রহীনতাই মানুষকে শেখ হাসিনার ওপর তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ৫ আগস্টের ঘটনায়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের ক্ষোভ জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো সুপ্ত ছিল।
কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে নির্বিচারে ছাত্র-জনতাকে হত্যার ঘটনায় সে আগ্নেয়গিরি লাভা উদ্গিরণ করে সবকিছু ভস্মীভূত করে দিয়েছে।
৮ আগস্ট রাতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নিয়েছে। এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সে দায়িত্ব পালনে সফল হোক, দেশ পুনরায় গণতন্ত্রের আলোয় উদ্ভাসিত হোক—দেশবাসীর প্রত্যাশা সেটাই।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
হঠাৎ করেই দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সবার হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট হয়ে গেছে। মাসাধিককালের আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগ। দেশে এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারে, তা কারোরই ধারণায় ছিল না।
এমনকি আমিও ভাবতে পারিনি এই স্বল্পকালীন আন্দোলন শেখ হাসিনাকে কাবু করতে পারবে। পরিচিতজনেরা আন্দোলনের পরিণতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমি তাই বলতাম, শেখ হাসিনা এবারও হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবেন। কিন্তু প্রমাণিত হলো, সবার সব ধারণা সব সময় সঠিক হয় না। যেমন হয়নি এবার আমার ধারণাও।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যখন জনসম্পৃক্তি বেড়েই চলছিল, তখন অনেকেই শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ওদের ডেকে কথা বলতে, দাবি পূরণ করতে। কিন্তু তিনি তা কানে নেননি; বরং তাঁর দলের সাধারণ সম্পাদক ‘ছাত্রলীগ’কে দিয়ে আন্দোলনকারীদের দমনের কথা বলার পর আন্দোলনের লেলিহান শিখা জ্বলে ওঠে। গোটা পরিস্থিতি চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
সংঘাত-সংঘর্ষে কয়েক শ মানুষের প্রাণহানি এবং কয়েক হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদ বিনষ্ট হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। খবর অনুযায়ী, তিনি এখন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
চেষ্টা করছেন অন্য কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার। শেখ হাসিনার এই পতনের উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আন্দোলনের মুখে একাধিক সরকারের পতন হলেও কোনো সরকারপ্রধান দেশত্যাগ করেননি। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হলেও তিনি পালিয়ে যাননি। আর ১৯৯৬ সালে আন্দোলনের চাপে পদত্যাগে বাধ্য হলেও খালেদা জিয়া দেশ ছেড়ে যাননি। এমনকি ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সরকার তাঁকে জোরপূর্বক বিদেশে পাঠিয়ে দিতে চাইলেও খালেদা জিয়া সম্মত হননি। তিনি ওই সরকারকে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, ‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, বাংলাদেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।
বাঁচলে এ দেশেই বাঁচব, মরলে এ দেশেই মরব।’ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশে থেকে মোকাবিলার এই সাহস খালেদা জিয়াকে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নেতায় পরিণত করেছে।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা তেমন সাহস দেখাতে পারেননি। তিনি গোপনে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। বীর সেনাপতিরা কখনো যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায় না। শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতি করতে গিয়ে অসংখ্যবার জেলে গেছেন। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান তাঁকে আগরতলা মামলার আসামি করে ফাঁসিতে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তিনি পালিয়ে যাননি।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই ইচ্ছে করলে পালিয়ে যেতে পারতেন। শেখ হাসিনা এত দিন দেশের জন্য তাঁর পিতার মতো বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়ার কথা বলতেন। কিন্তু বিপদ সমাসন্ন দেখে লাখ লাখ নেতা-কর্মীকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে বোনকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। একজন রাজনৈতিক নেতার এই অন্তর্ধান যে কত বড় গ্লানিকর, তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই জানেন। হয়তো শেখ হাসিনাও এখন তাঁর কৃতকর্মের কথা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন।
দীর্ঘ দেড় দশক দোর্দণ্ড প্রতাপে বাংলাদেশ শাসন করেছেন শেখ হাসিনা। তবে ক্ষমতার মসনদে তাঁর এই অধিষ্ঠান কখনোই প্রশ্নমুক্ত ছিল না। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশে-বিদেশে কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল ভোটারবিহীন। ২০১৮ সালে দিনের ভোট আগের রাতেই সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। আর তাঁর সর্বশেষ নির্বাচন, যেটি এ বছর ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেটাকে নির্বাচন-নির্বাচন খেলা বললে অত্যুক্তি হবে না। নিজ দলের নেতাদের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বানিয়ে যে নির্বাচন তিনি জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন, তা ছিল হাস্যকর। একই দলের নেতারা অবতীর্ণ হয়েছিলেন নির্বাচনী লড়াইয়ে। আর সেটা করতে গিয়ে ১৯৫৪ সাল থেকে ব্যবহৃত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকাকেও বিসর্জন দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা এবং তাঁর দলের নেতারা নিজেদের বিপুল জনপ্রিয় বলে দাবি করতেন। অথচ সেই জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একমাত্র নিক্তি ভোটকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার সাহস পাননি। হাইস্কুলে আমাদের অঙ্কের শিক্ষক আবদুল লতিফ স্যার বলতেন, ‘ফলাফল মেলাতে গিয়ে কেউ অঙ্কে “গোঁজামিল” দিয়ো না। আমার কাছে কিন্তু ধরা পড়ে যাবে।’ শেখ হাসিনা ভোটের বেলায় গোঁজামিল দিয়েছিলেন।
প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, ‘আপনি সব লোককে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারবেন, কিছু লোককে সব সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারবেন। তবে আপনি সব লোককে সব সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারবেন না।’ এ উক্তিটি জানা থাকলেও শেখ হাসিনা যে বিস্মৃত হয়েছিলেন, তা অনুমেয়। নাহলে জনগণ তথা ভোটারদের চোখে ‘লাগ ভেলকি লাগ’ বলে মনঃপূত ধুলো ছিটিয়ে পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘরে তুলতেন না।
গত সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সরকার কোনো ভালো কাজ যে করেনি তা কিন্তু নয়। এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী নদীর টানেল, ফ্লাইওভারসহ বড় বড় সব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশ্য এসব প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দ ও বরাদ্দ অর্থের ব্যবহার নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই একটি জাতিকে তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নয়। মানুষ খাওয়া-পরার পাশাপাশি কথা বলার অধিকার চায়; যেটাকে বলে বাক্স্বাধীনতা। বাক্স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ।
যে যত সাফাই গাক না কেন, এটা শিকার করতেই হবে যে শেখ হাসিনার পুরো আমলে বাংলাদেশে আক্ষরিক অর্থে গণতন্ত্র ছিল না। যেটা ছিল, তা হলো গণতন্ত্রের রেপ্লিকা। উদাহরণ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত তাজমহলের কথা বলা যায়। স্থাপনাটি দেখতে অবিকল তাজমহলের মতো, কিন্তু ওটার ভেতরে সম্রাজ্ঞী মমতাজের সমাধি নেই। তেমনি গত সাড়ে ১৫ বছর দেশে গণতন্ত্রের একটি বাতাবরণ তৈরি করে রাখা হয়েছিল, কিন্তু তা প্রকৃত গণতন্ত্র ছিল না।
না ছিল বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ-মিছিলের অধিকার, না ছিল হাত খুলে পত্রিকায় কলাম লেখার সুযোগ। টিভি টক শোতে সত্য উচ্চারণের সুযোগও ছিল না। সরকার কিংবা মন্ত্রী সাহেবানদের সমালোচনা করলে পড়তে হতো সংশ্লিষ্টদের রোষানলে। কখনো অলিখিত নির্দেশে বন্ধ হয়ে যেত কলাম ছাপানো, আবার কখনো টিভি টক শোতে অংশ নেওয়ার ডাক বন্ধ হয়ে যেত।
এ বিষয়ে অত্র নিবন্ধের লেখকের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। মূলত দেশের গণতন্ত্রহীনতাই মানুষকে শেখ হাসিনার ওপর তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ৫ আগস্টের ঘটনায়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের ক্ষোভ জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো সুপ্ত ছিল।
কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে নির্বিচারে ছাত্র-জনতাকে হত্যার ঘটনায় সে আগ্নেয়গিরি লাভা উদ্গিরণ করে সবকিছু ভস্মীভূত করে দিয়েছে।
৮ আগস্ট রাতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নিয়েছে। এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সে দায়িত্ব পালনে সফল হোক, দেশ পুনরায় গণতন্ত্রের আলোয় উদ্ভাসিত হোক—দেশবাসীর প্রত্যাশা সেটাই।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
বিআরটিসির বাস দিয়ে চালু করা বিশেষায়িত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) লেনে অনুমতি না নিয়েই চলছে বেসরকারি কোম্পানির কিছু বাস। ঢুকে পড়ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। উল্টো পথে চলছে মোটরসাইকেল। অন্যদিকে বিআরটিসির মাত্র ১০টি বাস চলাচল করায় সোয়া চার হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প থেকে...
৩ দিন আগেগাজীপুর মহানগরের বোর্ডবাজার এলাকার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা পিকনিকে যাচ্ছিলেন শ্রীপুরের মাটির মায়া ইকো রিসোর্টে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে বাসগুলো গ্রামের সরু সড়কে ঢোকার পর বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে যায় বিআরটিসির একটি দোতলা বাস...
২৪ নভেম্বর ২০২৪ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় সন্দ্বীপের ব্লক বেড়িবাঁধসহ একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫৬২ কোটি টাকা। এ জন্য টেন্ডারও হয়েছে। প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ শুরু করছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তাগাদায়ও কোনো কাজ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন...
২০ নভেম্বর ২০২৪দেশের পরিবহন খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রণকারী ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাইফুল আলমের নেতৃত্বাধীন এ কমিটিকে নিবন্ধন দেয়নি শ্রম অধিদপ্তর। তবে এটি কার্যক্রম চালাচ্ছে। কমিটির নেতারা অংশ নিচ্ছেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের...
২০ নভেম্বর ২০২৪